
অনলাইন ডেস্ক: গণহত্যাকারী ইসরাইল ও তাদের সহযোগী যুক্তরাষ্ট্র গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যৌথভাবে ইরানে হামলা চালায়। আগ্রাসন শুরুর দিনই ইসলামি প্রজাতন্ত্রের উপকূলীয় প্রদেশ হরমুজগানের মিনাব শহরে ভয়াবহ আক্রমণ করে ওয়াশিংটন ও তেল আবিব। সেখানে একটি বালিকা বিদ্যালয়ে মার্কিন টমাহক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা হয়েছিল বলে বেশ কয়েকটি প্রমাণ ইতোমধ্যে প্রকাশ হয়েছে। যদিও যুক্তরাষ্ট্র এখনও এর দায় স্বীকার করেনি। ওই হামলায় ১৮০ জনের মতো কোমলমতি শিশুর প্রাণ গেছে বলে স্থানীয় সংবাদ মাধ্যমের খবরে জানা গেছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মিনাবের শাজারেহ তাইয়্যেবা নামে বালিকা বিদ্যালয়টিকে ইচ্ছাকৃতভাবে লক্ষ্যবস্তু না করে থাকলে মার্কিন বাহিনী আবার তাদের ভুল নিশানা কিংবা নিখুঁত হামলার টার্গেট নির্ধারণে ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে। এর আগেও যুক্তরাষ্ট্রের সেনারা তথ্যগত ভুলের কারণে কিংবা নিখুঁত আক্রমণের ব্যর্থতার কারণে দেশে দেশে বহু বেসামরিক নাগরিক হত্যা করেছে।
আলজাজিরার এক প্রতিবেদনে জানা যায়, এর আগেও মার্কিন সেনারা ভুল লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালিয়ে বহু নিরীহ নাগরিককে হত্যা করেছে বলে পরে প্রমাণ বের হয়েছে।
কেবল সামরিক স্থাপনা ও নির্দিষ্ট ব্যক্তিদের লক্ষ্যবস্তু করার মার্কিন দাবি সত্ত্বেও, দেশটির সশস্ত্র বাহিনীর বেসামরিক মানুষ হত্যার দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে—যা কখনও কখনও ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টাও করা হয়েছে।
১৯৯৯ সালে যুগোস্লাভিয়ায় ন্যাটোর বোমা হামলার সময়, বেলগ্রেডে অবস্থিত চীনা দূতাবাসের একটি অংশকে যুগোস্লাভ সামরিক স্থাপনা হিসেবে ভুল শনাক্ত করে সেখানে হামলা চালিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র।
সেই হামলায় তিনজন চীনা সাংবাদিক নিহত এবং ২০ জনেরও বেশি মানুষ আহত হন।
ওয়াশিংটন পরে জানিয়েছিল যে, গোয়েন্দা বিশ্লেষকরা পুরনো ম্যাপের ওপর নির্ভর করার কারণে এই বোমা হামলা হয়েছে, যা ভুলবশত দূতাবাস প্রাঙ্গণকে একটি সামরিক লক্ষ্যবস্তু হিসেবে চিহ্নিত করেছিল।
ঘটনাটি চীনের সঙ্গে একটি বড় ধরনের কূটনৈতিক সংকট তৈরি করেছিল, যার ফলে বেইজিং এবং অন্যান্য শহরে মার্কিন কূটনৈতিক মিশনগুলোর সামনে বিশাল প্রতিবাদ কর্মসূচি পালিত হয়েছিল।
‘১৯৯১ সালে, ডেজার্ট স্টর্ম অভিযানের সময়, যুক্তরাষ্ট্র বাগদাদের আমিরিয়াহ বাঙ্কারেও হামলা চালিয়েছিল এই বিশ্বাসে যে সেটি একটি কমান্ড-অ্যান্ড-কন্ট্রোল (সামরিক নিয়ন্ত্রণ) কেন্দ্র,’ কানসিয়ান ব্যাখ্যা করেন।
কানসিয়ান আরও যোগ করেন, সেখানে কেবল বেসামরিক নাগরিকরাই ছিলেন এবং ৪০৩ জন নিহত হয়েছিলেন।
'অপারেশন ডেজার্ট স্টর্ম' ছিল উপসাগরীয় যুদ্ধের সময় যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে পরিচালিত একটি বিমান ও স্থল অভিযান, যা ১৯৯০ সালে ইরাকি নেতা সাদ্দাম হোসেন কুয়েত দখল করার পর শুরু হয়েছিল। ১৯৯১ সালের জানুয়ারিতে এই জোট ইরাকের সামরিক অবকাঠামো, নেতৃত্ব নেটওয়ার্ক এবং কমান্ড সেন্টারগুলো পঙ্গু করে দেওয়ার লক্ষ্যে দেশটিতে ব্যাপক বিমান হামলা শুরু করে।
সেই ঘটনায় দুটি সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যভেদী বোমা বাঙ্কারটি ভেদ করে ভেতরে আঘাত হানে, যার ফলে ৪০০ জনেরও বেশি মানুষ নিহত হয়, যাদের মধ্যে অনেক নারী ও শিশু ছিল। এই হামলাটি ওই যুদ্ধের সবচেয়ে ভয়াবহ বেসামরিক হতাহতের ঘটনায় পরিণত হয় এবং বিশ্বজুড়ে ব্যাপক নিন্দার ঝড় তোলে।
২০২১ সালে এক সাক্ষাৎকারে ফোর-স্টার জেনারেল মেরিল ম্যাকপিক বলেন, সেই সময়ে যুক্তরাষ্ট্র প্রাথমিকভাবে গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহের জন্য স্যাটেলাইটের ওপর নির্ভর করত।
সাংবাদিক সোফিয়া বারবারানিকে ম্যাকপিক বলেন, ‘আমাদের মাথায় কখনোই আসেনি যে এটি এমন কোনো জায়গা যেখানে বেসামরিক নাগরিকরা আশ্রয় নিতে পারে—আমরা এটিকে একটি সামরিক বাঙ্কার হিসেবেই ভেবেছিলাম, যেখানে কমান্ড-অ্যান্ড-কন্ট্রোল সুবিধা ছিল।’
ম্যাকপিক উপসাগরীয় যুদ্ধের সময় মার্কিন বিমান বাহিনীর চিফ অব স্টাফ ছিলেন।
বেলগ্রেডের ঘটনায়, সিআইএ লক্ষ্যবস্তু শনাক্ত করার জন্য দায়ী একজন মধ্য-স্তরের গোয়েন্দা কর্মকর্তাকে বরখাস্ত করেছিল। এছাড়া ছয়জন ঊর্ধ্বতন ব্যবস্থাপককে তিরস্কার করা হয়েছিল।
তবে কোনো ফৌজদারি মামলা দায়ের করা হয়নি। অবশ্য পরবর্তীতে যুক্তরাষ্ট্র চীন সরকারকে দূতাবাসের ক্ষয়ক্ষতির জন্য ২৮ মিলিয়ন ডলার এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে ৪ দশমিক ৫ মিলিয়ন ডলার ক্ষতিপূরণ দিয়েছিল।
আমিরিয়াহ বাঙ্কারের ঘটনায় মার্কিন সামরিক বাহিনী ওই হামলাকে ভুল হিসেবে গণ্য করেনি এবং কোনো কর্মীকে বরখাস্ত বা শাস্তির আওতায় আনা হয়নি। মার্কিন কর্মকর্তারা দাবি করেছিলেন, বাঙ্কারটি একটি বৈধ সামরিক লক্ষ্যবস্তু ছিল, যা বেসামরিক নাগরিকদের আশ্রয়ের জন্যও ব্যবহৃত হচ্ছিল।
এরও কয়েক দশক আগে, ১৯৬৮ সালে ভিয়েতনাম যুদ্ধের সময় যা 'মাই লাই গণহত্যা' হিসেবে পরিচিতি পায়, সেখানে মার্কিন সৈন্যরা একটি গ্রামের ৩৪৭ থেকে ৫০৪ বেসামরিক মানুষকে হত্যা করে এবং নারীদের দলবদ্ধভাবে ধর্ষণ করে।
মার্কিন সামরিক বাহিনী প্রথমে এই যুদ্ধাপরাধ ধামাচাপা দিয়েছিল, কিন্তু সাংবাদিক সেমুর হার্শ এবং রোনাল্ড রিডেনহাওয়ারের একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে মাই লাই-এর সেই ভয়াবহতা বিশ্বের সামনে চলে আসে। এটি যুক্তরাষ্ট্রে যুদ্ধবিরোধী মনোভাবকে উসকে দেয় এবং জবাবদিহিতার দাবি জোরালো করে।
যদিও এ ঘটনায় ২৬ জন সৈন্যের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়েছিল, কিন্তু কেবল একজনকে—সংশ্লিষ্ট প্লাটুনের নেতা লেফটেন্যান্ট উইলিয়াম ক্যালি জুনিয়রকে—দোষী সাব্যস্ত করা হয়। তাকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হলেও পরবর্তীতে তা কমিয়ে আনা হয়; শেষ পর্যন্ত তিনি মাত্র সাড়ে তিন বছর গৃহবন্দী হিসেবে সাজা ভোগ করেন।
মিনাবের স্কুলে বোমা হামলার তদন্ত এখনও চললেও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যুক্তরাষ্ট্র দায় স্বীকার করলেও এর পরিণতি সীমিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
কানসিয়ান বলেন, যদি এই ভুলের জন্য নির্দিষ্ট কোনো ব্যক্তিকে দায়ী করা যায়, তবেই কেবল বিভাগীয় শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার সম্ভাবনা থাকে।
তিনি আরও বলেন, ‘তবে মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী বারবার দায়িত্বরত সদস্যদের বলেছেন, 'আমি তোমাদের পাশে আছি', তাই শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম।