
অনুসন্ধানী বিশেষ রিপোর্ট (প্রথম পর্ব) :
কুমিল্লা কোতোয়ালি মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মহিনুল ইসলামের বিরুদ্ধে দায়িত্বে অবহেলা, হয়রানি, ‘মামলা বাণিজ্য’ এবং এমনকি অস্তিত্বহীন হত্যাকাণ্ডের মামলা দায়ের করে সাধারণ মানুষকে ফাঁসানোর মতো গুরুতর সব অভিযোগ উঠেছে। ২০২৪ সালের আগস্টে যোগদানের পর থেকে তার কর্মকাণ্ড নিয়ে ভুক্তভোগীদের অভিযোগের পাহাড় জমেছে। ‘দৈনিক বাংলা খবর’-র তিন পর্বের ধারাবাহিক অনুসন্ধানের আজ থাকছে প্রথম পর্ব।
‘মামলা বাণিজ্য’ ও রাজনৈতিক হয়রানির অভিযোগ :
অভিযোগ অনুযায়ী, ওসি মহিনুল ইসলাম গত বছরের রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে ব্যবহার করে একটি লাভজনক ‘মামলা বাণিজ্যের’ সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছেন। তার প্রধান লক্ষ্যবস্তু আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিরা হলেও, বহু সাধারণ নিরীহ মানুষও ‘আওয়ামী লীগার’ তকমা দিয়ে দায়ের করা মামলার শিকার হয়েছেন।
সাংবাদিককে ফাঁসাতে ১০ মাস পর ‘গায়েবী’ হত্যা মামলা?
সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর অভিযোগটি উঠেছে একটি অস্তিত্বহীন বা ‘গায়েবী’ হত্যা মামলা নিয়ে। অভিযোগ :
ওসি মহিনুল ব্যক্তিগত স্বার্থে হবিগঞ্জ থেকে একজন বাদীকে ডেকে এনে ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের একটি হত্যাকাণ্ড দেখিয়ে মামলা দায়ের করান। অথচ ওই দিন কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্ট এলাকায় রাফসান নামে কোনো যুবক খুনই হননি।
এই ভুয়া মামলায় ১৪৭ জনকে আসামি করা হয়, যার মধ্যে ১৪১ নম্বরে নাম রয়েছে ঢাকায় কর্মরত সাংবাদিক এম শাহীন আলমের, যিনি ওই সময়ে কুমিল্লাতেই ছিলেন না। রাজমিস্ত্রী থেকে শুরু করে খেটে খাওয়া বহু নিরীহ মানুষও এই মামলার আসামি।
সাবেক ওসির বক্তব্য ও আইনি প্রশ্ন :
मामलाটি নিয়ে তৎকালীন ওসি ফিরোজ হোসেনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বিস্ময় প্রকাশ করে বলেন, “৫ আগস্ট তো বিজয়ের দিন ছিল, সেদিন হত্যা হবে কেন?” তিনি নিশ্চিত করেন যে তার দায়িত্বকালে এমন কোনো ঘটনাই ঘটেনি। এতে প্রশ্ন উঠেছে, ওসি মহিনুল কোনো মেডিকেল সার্টিফিকেট বা প্রাথমিক তদন্ত ছাড়াই কিসের ভিত্তিতে এই হত্যা মামলাটি নথিভুক্ত করলেন এবং ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে ৭ জনকে গ্রেপ্তার করে জেলে পাঠালেন? ভুক্তভোগী পরিবারগুলো এখন ওসির বিরুদ্ধে পাল্টা আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে।
দায়িত্বে অবহেলা ও ভুক্তভোগীদের আরও অভিযোগ :
ওসি মহিনুলের বিরুদ্ধে অভিযোগের তালিকা এখানেই শেষ নয়।
অপহরণের মামলায় নিষ্ক্রিয়তা: সীপন নামের এক যুবক অপহৃত হলে তার পরিবার থানায় অভিযোগ করে। কিন্তু ওসি ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ৬ হাজার টাকা নিয়েও কোনো পদক্ষেপ নেননি বলে অভিযোগ। পরে ঢাকায় অন্য থানায় অভিযোগ করে ভিকটিমকে উদ্ধার করা হয়।
পারিবারিক কলহে ফাঁসানো :
রাসেল নামের এক যুবককে তার প্রভাবশালী চাচার সঙ্গে বিবাদের জেরে পুরনো তিনটি মামলায় আসামি দেখিয়ে বাড়ি থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরিবারের দাবি, ওসি বিপুল অর্থের বিনিময়ে এই কাজটি করেছেন।
বাদীকে উল্টো জেলে প্রেরণ :
তৌহিদ হিন আবসার নামে এক ব্যক্তি জানান, তিনি একটি মামলার বাদী হওয়ায় ওসি তাকে মামলা তুলে নিতে হুমকি দেন। রাজি না হওয়ায় তাকেই চাঁদাবাজির মিথ্যা মামলায় ফাঁসিয়ে ৮ দিন জেলে রাখা হয়।
অবৈধ সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণের অভিযোগ :
সর্বশেষ অভিযোগ অনুযায়ী, ওসি মহিনুল তার নিজস্ব ‘সোর্স’ নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে থানা এলাকার মাদক ব্যবসা, চোরাকারবার এবং আবাসিক হোটেলের আড়ালে দেহ ব্যবসার মতো অবৈধ কর্মকাণ্ড নিয়ন্ত্রণ করেন এবং সেখান থেকে নিয়মিত চাঁদা তোলেন।
এইসব অভিযোগের বিষয়ে ‘দৈনিক বাংলা খবর’-র অনুসন্ধান চলছে। আরও বিস্তারিত তথ্য নিয়ে পরবর্তী পর্বে চোখ রাখুন।