Doinik Bangla Khobor

কুমিল্লায় এসআই জনি কান্তির বিরুদ্ধে উদ্ধারকৃত ৮৪ কেজি গাঁজা আত্মসাৎ নিয়ে তদন্ত চলমান অভিযোগ প্রমাণিত হলে ব্যবস্থা : এসপি

বিশেষ প্রতিবেদক:
কুমিল্লা সদর দক্ষিণ মডেল থানার একটি মাদক মামলায় জব্দকৃত গাঁজার পরিমাণ, মামলার এজাহারে উল্লেখিত তথ্য, আসামিদের বক্তব্য এবং তদন্তে দীর্ঘসূত্রতা—সব মিলিয়ে নতুন করে নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। মামলার প্রধান আসামির অভিযোগ, পুলিশ ১৪৪ কেজি গাঁজা উদ্ধারের পর তার মধ্যে ৮৪ কেজি আত্মসাৎ করে মাত্র ৬০ কেজি গাঁজা জব্দ দেখিয়ে আদালতে মামলা পাঠিয়েছে। যদিও অভিযুক্ত পুলিশ কর্মকর্তারা এসব অভিযোগ সম্পূর্ণ অস্বীকার করেছেন।

এ ঘটনায় কুমিল্লা সদর দক্ষিণ মডেল থানার এসআই (নিঃ) জনি কান্তি দে (বিপি-৯০১৯২২৩৮২৫), এএসআই (নিঃ) মো. কবির হোসেন (বিপি-০১৬৪১-৫৪৬১৫৪), এএসআই (নিঃ) আলী আহমেদ (বিপি-৯৮১৭১৯৬৪৮৩) এবং কনস্টেবল মো. জাহাঙ্গীর আলম (বিপি-৯২১২১৫৩৫৯১)-এর বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগের উৎস মামলার ১ নম্বর আসামি ও পিকআপচালক মিজান, যিনি বর্তমানে জামিনে মুক্ত।

 

** ২০ এপ্রিলের ঘটনা, ২০ জুলাইও তদন্ত চলমান

অভিযোগ অনুযায়ী, ২০ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে অভিযান চালিয়ে একটি পিকআপ ভ্যান থেকে বিপুল পরিমাণ ভারতীয় গাঁজা উদ্ধার করা হয়। পরে ১০ জুন ২০২৬ তারিখে গণমাধ্যমে মাদক কারবারি মিজানের ভিডিও বক্তব্য প্রকাশিত হলে বিষয়টি আলোচনায় আসে।

এদিকে ২০ জুলাই ২০২৬ তারিখে কুমিল্লার পুলিশ সুপার (এসপি) আনিসুজ্জামান হোয়াটসঅ্যাপ কল ও মেসেজে গণমাধ্যমকে জানান, অভিযোগের তদন্ত চলছে। তদন্তে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

তবে তদন্তের অগ্রগতি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। কারণ মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন, ২০১৮ অনুযায়ী সাধারণভাবে মাদক মামলার তদন্ত ৩০ কার্যদিবসের মধ্যে শেষ করার বিধান রয়েছে। বিশেষ প্রয়োজন হলে আদালতের অনুমতি নিয়ে অতিরিক্ত ১৫ কার্যদিবস সময় নেওয়া যায়। কিন্তু অভিযোগ রয়েছে, নির্ধারিত সময় পেরিয়ে গেলেও মামলার তদন্ত শেষ হয়নি এবং বিভিন্ন অজুহাতে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলে বিলম্ব করা হচ্ছে।

** প্রধান আসামির অভিযোগ: ১৪৪ কেজি থেকে ৮৪ কেজি সরিয়ে নেওয়া হয়

জামিনে মুক্ত হওয়ার পর ভিডিও বক্তব্যে মামলার ১ নম্বর আসামি মিজান স্বীকার করেন, উদ্ধার হওয়া গাঁজা তার ছিল এবং তিনি মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। তবে তিনি দাবি করেন, তার পিকআপে মোট সাত বস্তায় ১৪৪ কেজি গাঁজা ছিল। তার ভাষ্য অনুযায়ী, পুলিশ তাকে আটক করার পর ঘটনাস্থলেই চার বস্তা বা প্রায় ৮৪ কেজি গাঁজা একটি সিএনজিতে তুলে অন্যত্র নিয়ে যায়। পরে মামলায় মাত্র ৬০ কেজি গাঁজা উদ্ধার দেখিয়ে আদালতে চালান দেওয়া হয়।

মিজানের আরও দাবি, তাকে ভাগলপুর এলাকা থেকে আটক করা হলেও মামলার এজাহারে গ্রেপ্তারের স্থান হিসেবে চৌয়ারা বাজারের ফুলতলী এলাকার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

তিনি অভিযোগ করেন, সুয়াগাজী বাজারের উত্তর-পশ্চিম পাশে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের পাশের একটি সিএনজি ফিলিং স্টেশনের সংলগ্ন সড়কে তার পিকআপ থামিয়ে গাঁজার চার বস্তা অন্যত্র সরিয়ে নেওয়া হয়।

** এই মামলার ২ নং আসামি ইকরামের দাবি: আমাকে অন্যায়ভাবে আসামি করা হয়েছে

মামলার ২ নম্বর আসামি হিসেবে সদর দক্ষিণ উপজেলার মুড়াপাড়া গ্রামের কলেজ শিক্ষার্থী ইকরাম হোসেনের নাম অন্তর্ভুক্ত করা হয়।
তবে ভিডিও বক্তব্যে ইকরাম দাবি করেন, তিনি কখনো মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িত ছিলেন না এবং তাকে সম্পূর্ণ অন্যায়ভাবে মামলায় আসামি করা হয়েছে।

তিনি বলেন, তার বিরুদ্ধে নিরপেক্ষ তদন্ত হোক। এলাকার ১০ জন মানুষের মধ্যে যদি দুইজনও বলতে পারেন যে তিনি মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িত, তাহলে প্রশাসন যে শাস্তি দেবে তিনি তা মেনে নেবেন।

তিনি আরও বলেন, অতীতে কিংবা বর্তমানে কোনো সময়ই তিনি মাদক কারবারের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন না। তাই তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত সত্য উদঘাটন করে তাকে মামলাটি থেকে অব্যাহতি দেওয়ার দাবি জানান।

** মাদক কারবারি মিজানের আরও অভিযোগ: ইকরামের নাম বলতে চাপ ও হুমকি

ভিডিও বক্তব্যে মিজান আরও অভিযোগ করেন, গ্রেপ্তারের পর এসআই জনি কান্তি দে তাকে তার ভাগিনা ইকরামের নাম বলার জন্য চাপ দেন।

তার দাবি, প্রায় এক মাস ২৭ দিন কারাভোগের পর জামিনে মুক্ত হয়ে নিজের মোবাইল ফোন ফেরত চাইতে থানায় গেলে পুনরায় ইকরামের বিরুদ্ধে বক্তব্য দিতে চাপ দেওয়া হয়। এতে রাজি না হওয়ায় ইয়াবা দিয়ে নতুন মামলা দেওয়া এবং শারীরিক ক্ষতির হুমকি দেওয়া হয় বলেও অভিযোগ করেন তিনি।

** এজাহারের তথ্য নিয়েও প্রশ্ন

মামলার এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে, ড্রাইভারের ডান পাশের সিটে থাকা এক ব্যক্তি পালিয়ে যান।
তবে সংশ্লিষ্টদের মতে, বাংলাদেশে ব্যবহৃত অধিকাংশ পিকআপ ভ্যানে চালকের ডান পাশে পৃথক যাত্রী আসন থাকে না। ফলে এজাহারের এই বর্ণনার যথার্থতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
এ ছাড়া গ্রেপ্তারের স্থান, জব্দকৃত গাঁজার পরিমাণ এবং আসামি অন্তর্ভুক্তির ভিত্তি নিয়েও বিভিন্ন অসঙ্গতির অভিযোগ সামনে এসেছে।

** এসআই জনি কান্তি দে যা বললেন

অভিযোগের বিষয়ে জানতে এসআই (নিঃ) জনি কান্তি দে-এর সঙ্গে মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি তার বিরুদ্ধে আনা সব অভিযোগ অস্বীকার করেন।

তিনি বলেন,আমার বিরুদ্ধে যে অভিযোগ আনা হয়েছে তা সম্পূর্ণ মিথ্যা। মামলার তদন্ত চলমান রয়েছে। এ বিষয়ে তদন্তকারী কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলতে পারেন।

১৪৪ কেজি গাঁজা উদ্ধার এবং ৮৪ কেজি সরিয়ে নেওয়ার অভিযোগ সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি অভিযোগটি নাকচ করে দেন।

একপর্যায়ে জনি কান্তি সাংবাদিককে প্রশ্ন করেন,
আপনি মাদক কারবারির পক্ষে আমাকে কল করেছেন কেন?

পরে তিনি পুনরায় দাবি করেন, তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের কোনো সত্যতা নেই।

ইকরামকে কী তথ্যের ভিত্তিতে আসামি করা হয়েছে—এমন প্রশ্নের জবাবে এসআই জনি কান্তি দে বলেন, গ্রেপ্তারকৃত আসামির প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে তার নাম মামলায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। তদন্তে সত্যতা না পাওয়া গেলে তার নাম বাদ দেওয়া হবে।

** ওসির বক্তব্য
এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে কুমিল্লা সদর দক্ষিণ মডেল থানার ওসি রকিবুল ইসলামের মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি
জানান, এই ঘটনার সময়ে আমি এই থানার দায়িত্বে ছিলাম না,আপনি জানিয়েছেন আমি বিষয়টি যেন দ্রুত সময়ের মধ্যে তদন্ত রিপোর্ট দেয় সেই ব্যপারে তদন্তকারী এসআই এর সাথে কথা বলবো।

** গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নগুলোর উত্তর এখনো মেলেনি

ঘটনাটি ঘিরে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে এসেছে—

* যদি সত্যিই ১৪৪ কেজি গাঁজা উদ্ধার হয়ে থাকে, তাহলে মামলায় ৬০ কেজি উল্লেখ করা হলো কেন?

* আর যদি ১৪৪ কেজি উদ্ধারের দাবি অসত্য হয়, তাহলে প্রধান আসামি এমন অভিযোগ কেন করছেন?

* গ্রেপ্তারের স্থান নিয়ে এজাহার ও আসামির বক্তব্যে ভিন্নতা কেন?

* কলেজ শিক্ষার্থী ইকরামকে কোন নির্ভরযোগ্য তথ্যের ভিত্তিতে আসামি করা হয়েছিল?

* তদন্ত নির্ধারিত সময়ের মধ্যে শেষ না হওয়ার কারণ কী?

** নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি

আইন অনুযায়ী, অভিযোগ মিথ্যা প্রমাণিত হলে মিথ্যা অভিযোগকারীদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। অন্যদিকে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে কঠোর প্রশাসনিক ও আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা প্রয়োজন।

কারণ, মাদক নিয়ন্ত্রণে দায়িত্বপ্রাপ্ত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের বিরুদ্ধে এ ধরনের অভিযোগ জনমনে আস্থার সংকট সৃষ্টি করতে পারে।

জনস্বার্থে উত্থাপিত এসব অভিযোগ, মামলার নথিতে থাকা অসঙ্গতি, ভিডিও বক্তব্য এবং তদন্তের দীর্ঘসূত্রতা বিবেচনায় বিষয়টি জেলা পুলিশ প্রশাসন, পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ এবং প্রয়োজন হলে একটি স্বাধীন তদন্ত সংস্থার মাধ্যমে নিরপেক্ষভাবে তদন্তের দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। অপরাধ বিচিত্রার “ঈগল টিম” এর তদন্ত অব্যাহত রয়েছে নতুন নতুন তথ্য নিয়ে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ না করা পর্যন্ত নিউজ চলমান থাকবে।