
এজাহার, তদন্ত প্রতিবেদন ও অভিযোগপত্রে জিডি নম্বর, অভিযানের সময়, আসামির অবস্থান, গাড়ির তথ্য ও আলামতের হিসাবে একাধিক গরমিল; ১৪৪ কেজি গাঁজা উদ্ধারের দাবি নিয়ে ৮৪ কেজি সরিয়ে নেওয়ার অভিযোগ
বিশেষ প্রতিবেদক :
কুমিল্লা সদর দক্ষিণ মডেল থানায় ৬০ কেজি গাঁজা উদ্ধারের ঘটনায় দায়ের করা একটি মাদক মামলার এজাহার, তদন্ত প্রতিবেদন ও অভিযোগপত্রের বিভিন্ন অংশ পর্যালোচনায় সময় তারিখ, জিডি নম্বর, আসামির অবস্থান, গাড়ির তথ্য, আলামতের ওজন এবং তদন্ত-সংক্রান্ত বিভিন্ন তথ্যের মধ্যে একাধিক অসঙ্গতি নিয়ে অভিযোগ উঠেছে।
একই সঙ্গে মামলার ১ নম্বর আসামি ও পিকাপ চালক মিজান মিয়ার পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়েছে, তার পিকআপ থেকে প্রকৃতপক্ষে আনুমানিক ১৪৪ কেজি গাঁজা উদ্ধারের পর এর প্রায় ৮৪ কেজি চারটি বস্তায় করে একটি সিএনজিযোগে অন্যত্র সরিয়ে নেওয়া হয় এবং পরে মাত্র ৬০ কেজি গাঁজা জব্দ দেখিয়ে মামলা করা হয়।
** মামলার এজাহার ও তদন্ত রিপোর্ট অনুযায়ী অভিযানের সময় নিয়েও প্রশ্ন :
মামলাটির সূত্রে মতে জানা যায়, এই মামলার এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে, ২০ এপ্রিল ২০২৬ রাত ৮টা ৫ মিনিটে পুলিশ মোস্তফাপুর এলাকায় অবস্থানকালে গোপন সংবাদের মাধ্যমে জানতে পারে একটি পিকআপে করে গাঁজা পরিবহন করা হচ্ছে।
এরপর রাত ৮টা ২০ মিনিটে ফুলতলী এলাকায় গিয়ে অস্থায়ী চেকপোস্ট স্থাপন এবং রাত ৮টা ৪০ মিনিটে সন্দেহজনক পিকআপটি থামানোর কথা বলা হয়েছে। পরবর্তীতে রাত ৮টা ৫৫ মিনিটে জব্দ তালিকা প্রস্তুতের তথ্যও নথিতে রয়েছে।
এখন প্রশ্ন হলো গোপন সংবাদ পাওয়ার পর পুলিশ দলের ঘটনাস্থলে যাত্রা, চেকপোস্ট স্থাপন, গাড়ি শনাক্ত ও থামানো, তল্লাশি, আলামত উদ্ধার, ওজন নির্ধারণ এবং জব্দ তালিকা প্রস্তুতের পুরো সময়সূচি পুলিশের মূল জিডি, ডিউটি রোস্টার, মুভমেন্ট রেজিস্টার ও সংশ্লিষ্ট পুলিশ সদস্যদের দায়িত্ব পালনের তথ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ এবং অসংগতি ও সার্বিক গরমিলের বার্তা বহন করে।
** একই ঘটনায় জিডি নম্বর ১০৫৮ নাকি ১০৬৮?
মামলার এজাহারের এক স্থানে অভিযানের ভিত্তি হিসেবে সদর দক্ষিণ মডেল থানার জিডি নম্বর ১০৫৮, তারিখ ২০/০৪/২০২৬ উল্লেখ করা হয়েছে।
অন্যদিকে তদন্ত প্রতিবেদনের আরেক অংশে একই অভিযানের ক্ষেত্রে জিডি নম্বর ১০৬৮, তারিখ ২০/০৪/২০২৬ উল্লেখ করা হয়েছে।
একই ঘটনার ক্ষেত্রে দুটি পৃথক জিডি নম্বর ব্যবহারের কারণ নথিতে স্পষ্ট নয়।
** মামলাটির আসামি,আসামির অবস্থান নিয়েও নানান প্রশ্ন আর গরমিলের আবাস :
মামলাটির এজাহারে বলা হয়েছে, পিকআপ থামানোর পর চালকসহ গাড়িতে থাকা কয়েকজন ব্যক্তি পালানোর চেষ্টা করেন। সেখানে চালকের ডান পাশে বসা একজন এবং গাড়ির পেছনে থাকা আরেকজন পালিয়ে যাওয়ার বর্ণনা রয়েছে।
কিন্তু তদন্তের অন্য অংশে দ্বিতীয় আসামি ইকরান হোসেনকে চালকের বাম পাশে বসা ব্যক্তি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
এখানে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে ইকরান হোসেন গাড়ির কোন পাশে বসেছিলেন তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।কারণ আসামির অবস্থান নির্ধারণ মামলায় তার ভূমিকা প্রমাণের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
** পুলিশের তথ্য অনুযায়ী ৬০ কেজি গাঁজার ওজনের হিসাব নিয়েও প্রশ্ন :
অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, তিনটি সাদা প্লাস্টিকের বস্তায় ১০টি করে মোট ৩০টি পুঁটলি ছিল এবং প্রতিটি পুঁটলিতে ২ কেজি করে মোট ৬০ কেজি গাঁজা পাওয়া যায়।
কিন্তু নথির বিভিন্ন অংশে আলামতের ওজন লেখার ক্ষেত্রে ‘৩০০২ কেজি ৬০ কেজি’, ‘৩০ ০২ কেজি’সহ অস্পষ্ট পাঠ পাওয়া যাচ্ছে।
অন্যদিকে পরবর্তী হিসাব অনুযায়ী ১০০ গ্রাম নমুনা রাসায়নিক পরীক্ষার জন্য পাঠানো, ৫৯ কেজি ৫০০ গ্রাম ধ্বংস এবং ৪০০ গ্রাম আদালতে পাঠানোর কথা বলা হয়েছে।
এই তিনটি পরিমাণ যোগ করলে মোট ৬০ কেজি হয়। অর্থাৎ পরবর্তী হিসাবটি ৬০ কেজির সঙ্গে গাণিতিকভাবে সামঞ্জস্যপূর্ণ হলেও প্রশ্ন থেকে যায়—জব্দের সময় ৬০ কেজি কীভাবে নির্ধারণ করা হয়েছিল? প্রতিটি পুঁটলি কি পৃথকভাবে ওজন করা হয়েছিল? ওজন মাপার যন্ত্র কী ছিল? জব্দ তালিকায় ওজন নির্ধারণের পদ্ধতি উল্লেখ ছিল কি না এবং জব্দের সময় উপস্থিত সাক্ষীরা ওজন প্রক্রিয়া প্রত্যক্ষ করেছিলেন কি না।
এসব প্রশ্নের উত্তর পেতে মূল জব্দ তালিকা, আলামত গ্রহণের রেকর্ড, নমুনা গ্রহণের নথি এবং ধ্বংসের আদালত আদেশ পরীক্ষা করা প্রয়োজন।
** ১৪৪ কেজি বনাম ৬০কেজি অভিযোগের সত্যতা যাচাই জরুরি
এই মামলার ১ নম্বর আসামি মিজান হোসেনের পক্ষ থেকে সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগ হলো—পিকআপে মোট সাতটি বস্তায় আনুমানিক ১৪৪ কেজি গাঁজা ছিল। তার দাবি, এর মধ্যে চারটি বস্তায় থাকা প্রায় ৮৪ কেজি গাঁজা একটি সিএনজিতে তুলে অন্যত্র সরিয়ে নেওয়া হয়।
পরে মামলায় মাত্র ৬০ কেজি গাঁজা জব্দ দেখানো হয় বলে তার অভিযোগ।
এই অভিযোগের সত্যতা প্রমাণ বা খণ্ডনের জন্য ঘটনাস্থলের প্রত্যক্ষদর্শী, জব্দ তালিকার সাক্ষী, সংশ্লিষ্ট পুলিশ সদস্য, সিএনজিচালক, আশপাশের সিসিটিভি ফুটেজ, ভিডিও ফুটেজ এবং আলামত সংরক্ষণ ও হস্তান্তরের রেকর্ড পরীক্ষা করা জরুরি।
যদি ১৪৪ কেজি উদ্ধারের অভিযোগ সত্য হয়, তাহলে বাকি ৮৪ কেজির অবস্থান নির্ধারণ করা তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। আবার অভিযোগটি সত্য না হলে ১৪৪ কেজির দাবি কীভাবে সৃষ্টি হলো, সেটিও অনুসন্ধান করা জরুরি নয় কি।
** গাঁজা সহ জব্দকৃত পিকাপ গাড়ির ইঞ্জিন ও চেসিস নম্বরেও যাচাই নিয়েও প্রশ্ন :
মামলায় ব্যবহৃত পিকআপের রেজিস্ট্রেশন নম্বর হিসেবে ঢাকা মেট্রো-ন-১৮-০৩৭৪ উল্লেখ করা হয়েছে।
নথিতে গাড়ির ইঞ্জিন ও চেসিস নম্বরের পাঠ নিয়েও অস্পষ্টতার অভিযোগ রয়েছে। কোথাও ইঞ্জিন নম্বরের পাঠে পার্থক্য দেখা যায় বলে দাবি করা হয়েছে। চেসিস নম্বর হিসেবে MAT445235EZR24931 উল্লেখ রয়েছে।
গাড়িটি মামলার গুরুত্বপূর্ণ আলামত হওয়ায় জব্দ তালিকায় থাকা রেজিস্ট্রেশন নম্বর, ইঞ্জিন নম্বর ও চেসিস নম্বরের সঙ্গে বিআরটিএর মূল রেকর্ড হুবহু মিলিয়ে দেখা প্রয়োজন।
বিশেষ করে গাড়িটির প্রকৃত মালিকানা, ব্যবহারকারী, চালক এবং ঘটনার দিন গাড়িটি কার নিয়ন্ত্রণে ছিলএসব তথ্যও তদন্তের আওতায় থাকা জরুরি।
** মাদক বহনকারী গাড়ির মালিককে অব্যাহতির তদন্ত রিপোর্ট নিয়েও প্রশ্ন :
তদন্ত প্রতিবেদনে বিআরটিএ রিপোর্ট ও গাড়ি ক্রয়-বিক্রয় সংক্রান্ত কাগজপত্র পর্যালোচনার পর তাহেরকে গাড়িটির প্রকৃত মালিক হিসেবে প্রতীয়মান হওয়ার কথা বলা হয়েছে। একই সঙ্গে তার বিরুদ্ধে মামলার ঘটনায় জড়িত থাকার নির্ভরযোগ্য সাক্ষ্যপ্রমাণ না পাওয়ায় তার বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হয়নি বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে অনুসন্ধানের প্রশ্ন হলো গাড়ির মালিক গাড়িটি কাকে ব্যবহার করতে দিয়েছিলেন? চালক মিজানের সঙ্গে মালিকের সম্পর্ক কী? গাড়িটি ভাড়া দেওয়া হয়ে থাকলে কোনো চুক্তি ছিল কি না? ঘটনার দিন গাড়ির নিয়ন্ত্রণ কার কাছে ছিল?
** এই মাদক মামলাটির আলামতের চেইন অব কাস্টডি নিয়েও প্রশ্ন :
তদন্ত প্রতিবেদনে জব্দকৃত আলামত থেকে ১০০ গ্রাম নমুনা রাসায়নিক পরীক্ষার জন্য পাঠানো এবং পরীক্ষাগারে সেটিকে গাঁজা হিসেবে শনাক্ত করার কথা উল্লেখ রয়েছে।
কিন্তু আলামত জব্দের পর কোথায় রাখা হয়েছিল, কখন থানায় জমা দেওয়া হয়েছিল, কোন রেজিস্টারে বা পিআর নম্বরে সংরক্ষণ করা হয়েছিল, নমুনা কখন গ্রহণ করা হয়, কখন পরীক্ষাগারে পাঠানো হয় এবং পরীক্ষাগারে পৌঁছানোর আগ পর্যন্ত আলামতের সিল অক্ষত ছিল কি না এসব তথ্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো সার্বিক বিষয়টির অধিকতর তদন্ত হয়েছে কিনা তা নিয়ে প্রশ্ন।
** পুলিশের মর্জি অনুযায়ী অজ্ঞাতনামা আসামি শনাক্তে তদন্ত কতটা কার্যকর :
এজাহার ও তদন্ত প্রতিবেদনে গাড়িতে থাকা আরও একজন অজ্ঞাতনামা ব্যক্তির পালিয়ে যাওয়ার কথা বলা হয়েছে। পরে ব্যাপক তদন্ত করেও তাকে শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি বলে তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে।
তদন্তকারী কর্মকর্তা সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহের চেষ্টা, স্থানীয়দের জিজ্ঞাসাবাদ এবং তথ্যদাতাদের মাধ্যমে পরিচয় শনাক্তের চেষ্টা করেছেন বলে নথিতে উল্লেখ থাকলেও অনুসন্ধানের ক্ষেত্রে প্রশ্ন হলো ঘটনাস্থল ও আশপাশে ঠিক কোন কোন সিসিটিভি ক্যামেরা ছিল? ফুটেজ চাওয়া হয়েছিল কি না? ফুটেজ পাওয়া না গেলে তার কারণ কী? কতজন প্রত্যক্ষদর্শীর বক্তব্য নেওয়া হয়েছিল?
** তদন্ত রিপোর্টে আসামিদেরকে কিসের ভিত্তিতে তদন্তকারী কর্মকর্তা "পেশাদার মাদক ব্যবসায়ী" হিসেবে চিহ্নিত করেন? :
তদন্ত প্রতিবেদনে মিজান ও ইকরান হোসেনকে "পেশাদার মাদক ব্যবসায়ী" হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। একই নথির অন্য অংশে আসামিদের পূর্ব অপরাধের ইতিহাসের ঘরে "নাই" লেখা রয়েছে।
এই দুই তথ্যের মধ্যে একটি ব্যাখ্যাগত প্রশ্ন তৈরি হয়। প্রশ্ন হলো যদি পূর্ব অপরাধের ইতিহাস না থাকে, তাহলে কোন সাক্ষ্য, গোয়েন্দা তথ্য, পূর্ববর্তী নজরদারি, আর্থিক লেনদেন, যোগাযোগের তথ্য অথবা অন্য কোনো প্রমাণের ভিত্তিতে তাদের ‘পেশাদার মাদক ব্যবসায়ী’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে তা তদন্ত প্রতিবেদনে স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন।
মামলার তদন্তের ভাষাগত বা মূল্যায়নগত বিষয় হলে তার ভিত্তিও নথিতে থাকা উচিত।
** মামলার তারিখে ২০২৪ ও ২০২৯ সালের উল্লেখ কীভাবে? :
অভিযোগপত্র নম্বর ১৮৬-এর তারিখ ১৮ জুলাই ২০২৬ বলা হয়েছে। কিন্তু নথির অন্য অংশে ১৮/০৭/২০২৯ ধরনের তারিখ দেখা যায় বলে অভিযোগ রয়েছে।
এছাড়া তদন্তকারী কর্মকর্তার স্বাক্ষরের পাশে ০৬/০৯/২০২৪ তারিখ দেখা যাওয়ার বিষয়টিও প্রশ্ন তুলেছে।
** ইকরান হোসেনকে মামলায় জড়ানোর অভিযোগ :
মিজান মিয়ার লিখিত অভিযোগের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো, তার সঙ্গে থাকা ইকরান হোসেনকে মামলায় আসামি করার জন্য তাকে চাপ ও ভয়ভীতি দেখানো হয়েছে।
মিজানের দাবি, ইকরান মাদক পরিবহন বা কারবারের সঙ্গে জড়িত ছিলেন না এবং তার নাম বলার জন্য তাকে চাপ দেওয়া হয়েছিল।
এমনকি ইকরানের নাম বলতে অস্বীকৃতি জানালে তাকে এক হাজার ইয়াবা দিয়ে পুনরায় মাদক মামলায় ফাঁসানোর হুমকি দেওয়া হয়েছে বলেও অভিযোগ করা হয়েছে।
** মামলাটির তদন্তকারী কর্মকর্তা এসআই হারুনের বক্তব্যও যাচাইযোগ্য
মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা এসআই হারুনের বক্তব্য অনুযায়ী, মিজানকে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদ করে ইকরান হোসেনের সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়া গেছে বলে উল্লেখ রয়েছে।
কিন্তু মিজানের প্রশ্ন তিনি যখন এসআই জনি কান্তি দে-এর হাতে গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে পাঠানো হন, তখন তদন্তকারী কর্মকর্তা এসআই হারুন কখন, কোথায় এবং কার উপস্থিতিতে তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছিলেন?
(যদি এ ধরনের জিজ্ঞাসাবাদ হয়ে থাকে, তাহলে তার তারিখ, সময়, স্থান, সংশ্লিষ্ট রেকর্ড এবং উপস্থিত ব্যক্তিদের তথ্য মিলিয়ে দেখা প্রয়োজন।)
বিশেষ করে ইকরানের সম্পৃক্ততা সম্পর্কে মিজানের কাছ থেকে কোনো বক্তব্য নেওয়া হয়ে থাকলে তার প্রকৃত প্রেক্ষাপট ও আইনগত ভিত্তি যাচাই করা জরুরি।
** ১নং আসামি ড্রাইভার মিজান মিয়ার মৃত মাকে নিয়ে অশালীন ভাষায় গালিগালাজের অভিযোগ এসআই জনি কান্তি দে এর বিরুদ্ধে :
১নং আসামি মিজান মিয়ার অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, জিজ্ঞাসাবাদের সময় এসআই জনি কান্তি দে তার মৃত মাকে নিয়ে অশালীন ও অপমানজনক ভাষা ব্যবহার করেন।
এই অভিযোগেরও সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রয়োজন। সংশ্লিষ্ট সময়ের থানার সিসিটিভি ফুটেজ, উপস্থিত পুলিশ সদস্য ও অন্য ব্যক্তিদের বক্তব্যসহ আইনসম্মতভাবে পাওয়া যায় এমন প্রমাণ পরীক্ষা করা।
** জামিনের পরও চাপ দেওয়ার অভিযোগ :
মিজানের দাবি, প্রায় এক মাস ২৭ দিন কারাভোগের পর জামিনে মুক্ত হয়ে মোবাইল ফোন ফেরত নিতে থানায় গেলে তাকে আবারও ইকরান হোসেনের বিরুদ্ধে বক্তব্য দেওয়ার জন্য তাকে চাপ দেয় এসআই জনি কান্তি দে।
তিনি অভিযোগ করেন, ইকরানের বিরুদ্ধে বক্তব্য দিতে অস্বীকৃতি জানালে তাকে পুনরায় মাদক মামলায় ফাঁসানো এবং ক্ষতি করার ভয় দেখানো হয়।
** যেসব সকল নথি ও তথ্য যাচাই হলে প্রকৃত ঘটনা স্পষ্ট হতে পারে এবং মামলাটি নিয়ে ওঠা প্রশ্নের নিরপেক্ষ নিষ্পত্তির জন্য অন্তত নিম্নোক্ত নথি ও তথ্য পর্যালোচনা করা প্রয়োজন তা হলো :
১. ২০ এপ্রিল ২০২৬ তারিখের মূল জিডি রেজিস্টার—বিশেষ করে ১০৫৮ ও ১০৬৮ নম্বর জিডি।
২. পুলিশের ডিউটি রোস্টার ও মুভমেন্ট রেজিস্টার।
৩. এজাহারের মূল কপি।
৪. মূল জব্দ তালিকা।
৫. ঘটনাস্থলের স্কেচ ম্যাপ ও সূচিপত্র।
৬. সংশ্লিষ্ট পুলিশ সদস্যদের ১৬১ ধারার জবানবন্দি।
৭. জব্দ তালিকার সাক্ষীদের বক্তব্য।
৮. পিকআপের বিআরটিএ মালিকানা ও কারিগরি তথ্য।
৯. গাড়ির ইঞ্জিন ও চেসিস নম্বরের মূল রেকর্ড।
১০. আলামত থানায় জমা ও সংরক্ষণের রেজিস্টার।
১১. নমুনা গ্রহণ ও রাসায়নিক পরীক্ষার নথি।
১২. আলামত ধ্বংসের আদালত আদেশ ও সংশ্লিষ্ট রেকর্ড।
১৩. ঘটনাস্থল ও আশপাশের সিসিটিভি ফুটেজ।
১৪. অভিযোগে উল্লিখিত সিএনজির পরিচয় ও চলাচল-সংক্রান্ত তথ্য।
১৫. আসামিদের জিজ্ঞাসাবাদ-সংক্রান্ত নথি বা আইনসম্মত রেকর্ড।
এছাড়াও মামলার নথি ও মিজান মিয়ার অভিযোগকে পাশাপাশি রাখলে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আসে, তা হলো :
প্রথমত, একই ঘটনার ক্ষেত্রে জিডি নম্বর ১০৫৮ নাকি ১০৬৮—কোনটি সঠিক?
দ্বিতীয়ত, ইকরান হোসেন গাড়ির চালকের কোন পাশে বসেছিলেন এবং নথির দুই ধরনের বর্ণনার কারণ কী?
তৃতীয়ত, পিকআপে মোট কতজন ব্যক্তি ছিলেন?
চতুর্থত, অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিকে শনাক্তে তদন্তে কী কী কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল?
পঞ্চমত, জব্দের সময় ৬০ কেজি গাঁজার ওজন কীভাবে নির্ধারণ করা হয়েছিল?
ষষ্ঠত, মিজানের দাবি করা ১৪৪ কেজি গাঁজার বিষয়টি সত্য হলে বাকি আনুমানিক ৮৪ কেজি কোথায় গেল?
সপ্তমত, জব্দের প্রকৃত স্থান এবং মামলার নথিতে উল্লেখিত স্থান একই কি না?
অষ্টমত, গাড়ির ইঞ্জিন ও চেসিস নম্বর বিআরটিএর মূল তথ্যের সঙ্গে হুবহু মেলে কি না?
নবমত, গাড়ির মালিকের কাছ থেকে মিজান কীভাবে গাড়িটি পেয়েছিলেন এবং ঘটনার সময় গাড়ির প্রকৃত নিয়ন্ত্রণ কার হাতে ছিল?
দশমত, পূর্ব অপরাধের ইতিহাস না থাকার পরও মিজান ও ইকরামকে ‘পেশাদার মাদক ব্যবসায়ী’ হিসেবে উল্লেখ করার ভিত্তি কী?
একাদশত, ২০২৬ সালের মামলার নথিতে ২০২৪ ও ২০২৯ সালের তারিখ কীভাবে এসেছে?
দ্বাদশত, মিজানের কাছ থেকে ইকরামের সম্পৃক্ততা সম্পর্কে বক্তব্য নেওয়া হয়ে থাকলে তা কখন, কোথায় এবং কীভাবে নেওয়া হয়েছিল?
** মামলাটির অধিকতর তদন্তের দাবি উঠছে :
মামলার নথিতে থাকা এসব অসঙ্গতি এবং ১৪৪ কেজি বনাম ৬০ কেজি গাঁজার অভিযোগের কারণে বিষয়টি নিয়ে নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি উঠেছে।
বিশেষ করে অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তাদের পাশাপাশি জব্দ তালিকার সাক্ষী, স্থানীয় প্রত্যক্ষদর্শী, গাড়ির মালিক, চালক এবং মামলার তদন্ত কর্মকর্তার বক্তব্য নেওয়া প্রয়োজন।
একই সঙ্গে মূল জিডি, এজাহার, জব্দ তালিকা, আলামত সংরক্ষণ রেজিস্টার, রাসায়নিক পরীক্ষার নথি, আদালতের আদেশ এবং বিআরটিএর তথ্য পরস্পরের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা জরুরি।
উপরোক্ত বিষয়ে মতামত এবং বক্তব্য জানার জন্য কুমিল্লা সদর দক্ষিণ মডেল থানার ওসি রাকিবুল ইসলাম জানান,মামলার তদন্ত রিপোর্টের যে কোন ভুল কিংবা সমস্যা হলে তা দেখেন সদর দক্ষিণ সার্কেল স্যার সহ পুলিশের উর্ধতন কর্মকর্তারা। এখানে এই বিষয়ে কোন করার আমার এখতিয়ার নেই।
একই সঙ্গে এসআই (নিঃ) জনি কান্তি দে-এর বিরুদ্ধে মিজান হোসেনের উত্থাপিত ৮৪ কেজি গাঁজা সরিয়ে নেওয়া, ইকরান হোসেনকে মামলায় জড়ানোর জন্য চাপ, পুনরায় মাদক মামলায় ফাঁসানোর হুমকি এবং অশালীন আচরণের অভিযোগগুলোরও পৃথকভাবে সত্যতা যাচাই করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সচেতন মহল।