বিশেষ প্রতিবেদক: দীর্ঘদিন ধরে ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক বলয়ের ছত্রছায়ায় থেকে দুর্নীতি ও অবৈধ সম্পদ গড়ার অভিযোগ উঠেছে শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের হবিগঞ্জ জেলার নির্বাহী প্রকৌশলী আলেক হোসেন (জুয়েল)-এর বিরুদ্ধে। অভিযোগ রয়েছে, সাবেক ছাত্রলীগ ক্যাডার পরিচয়ে রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে গত দেড় দশকে তিনি বিপুল পরিমাণ অবৈধ সম্পদের মালিক হয়েছেন। তবে এতসব অভিযোগের পরও এখন পর্যন্ত তার বিরুদ্ধে দৃশ্যমান কোনো প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
অনুসন্ধানে জানা যায়, আলেক হোসেনের পারিবারিক শেকড় ভারতীয় বংশোদ্ভূত। শৈশব ও শিক্ষা জীবনের একটি বড় সময় তিনি কুমিল্লা সদরে কাটান। ফেনী পলিটেকনিক্যাল কলেজে অধ্যয়নকালে ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে সক্রিয়ভাবে যুক্ত হন। সেই সূত্রেই কুমিল্লার প্রভাবশালী আওয়ামী লীগ নেতাদের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠতা তৈরি হয়।
১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় থাকাকালে কুমিল্লা-১৪ (চৌদ্দগ্রাম) আসনের সাবেক সংসদ সদস্য মুজিবুল হক মুজিব এবং কুমিল্লা সদর আসনের তৎকালীন এমপি এটিএম শামসুল হকের তদবিরে তিনি শিক্ষা সহকারী প্রকৌশলী হিসেবে সরকারি চাকরিতে যোগ দেন—এমন অভিযোগ স্থানীয় সূত্রের।
বর্তমানে তিনি সিলেট বিভাগের হবিগঞ্জ জেলা শিক্ষা প্রকৌশল দপ্তরে নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে কর্মরত রয়েছেন। গত বছরের ৫ আগস্টের পর তিনি এ পদে যোগদান করেন।
স্থানীয় সূত্র ও অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, গত ১৫ বছরে আওয়ামী শাসনামলে কুমিল্লা শিক্ষা প্রকৌশল দপ্তরে দায়িত্ব পালনকালে তিনি রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে ব্যাপক দুর্নীতির মাধ্যমে বিপুল সম্পদ গড়ে তুলেছেন।
অভিযোগ অনুযায়ী— ২০২০–২০২৪ সালের মধ্যে নিজ এলাকায় প্রায় ১৮৬ শতক জমি ক্রয় করেন, যার বাজারমূল্য আনুমানিক ২.৫ থেকে ৩ কোটি টাকা।
কুমিল্লার নিজ গ্রামে নির্মাণ করেন বিলাসবহুল ডুপ্লেক্স বাড়ি, গড়ে তোলেন কোটি টাকার গরুর খামার ও মাছের ফিশারি।
তার ও তার স্ত্রীর নামে কুমিল্লা শহরের ধর্মসাগর পৌর পার্ক সংলগ্ন এলাকা,
দারোগাবাড়ি মাজার এলাকা সহ একাধিক স্থানে একাধিক ফ্ল্যাট রয়েছে বলে জানা গেছে।
রাজধানী ঢাকার গাবতলী–মিরপুর বেড়িবাঁধ এলাকায় রয়েছে তার একটি বহুতল বিলাসবহুল ভবন।
বান্দরবানে দায়িত্ব পালনকালে সেখানে একটি রিসোর্ট, যৌথ মালিকানায় বিপুল জমি এবং পৌর এলাকার বালাঘাটা মৌজার শৈলশোভা হাউজিংয়ে একটি বাড়ির সন্ধান পাওয়া গেছে।
তার স্ত্রী হাসনা আক্তার মৈশানের নামে কুমিল্লার চান্দিনা উপজেলায় বিঘা বিঘা জমি কেনার অভিযোগ রয়েছে, যা পরে দুদকের ভয়ে বিক্রি করা হয়েছে বলেও সূত্র জানিয়েছে।
একজন শিক্ষা নির্বাহী প্রকৌশলীর সরকারি বেতন কাঠামোর সঙ্গে এই বিপুল সম্পদের কোনো সামঞ্জস্য নেই—এমন প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয়রা। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক ব্যক্তি জানান, এসব সম্পদ গড়তে রাজনৈতিক ছত্রছায়া ও অবৈধ লেনদেনই ছিল মূল হাতিয়ার।
আরও অভিযোগ রয়েছে, নিজের বিরুদ্ধে চলমান অনুসন্ধান ও লেখালেখির জেরে পারিবারিক বিরোধ থেকে ভাতিজা রাসেলকে রাজনৈতিক মামলায় ফাঁসানো হয়েছে। স্থানীয় সূত্রের দাবি, জুলাই–আগস্ট আন্দোলনের এক বছর পর ছাত্র জনতার ওপর হামলার মামলায় পুলিশ কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগসাজশে রাসেলকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে তিনি জামিনে মুক্ত হন।
জানা গেছে, গাবতলীর বহুতল ভবন নিয়ে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) আলেক হোসেনকে তলব করেছিল। তবে রাজনৈতিক তদবির ও অর্থব্যয়ের মাধ্যমে তিনি সে সময় রেহাই পান।
এতসব অভিযোগ সত্ত্বেও আলেক হোসেন এখনো বহাল তবিয়তে দায়িত্ব পালন করায় প্রশ্ন উঠেছে প্রশাসনিক স্বচ্ছতা নিয়ে। সচেতন মহল শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তর ও দুর্নীতি দমন কমিশনের জরুরি হস্তক্ষেপ দাবি করেছে।
এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে আলেক হোসেন জুয়েলের সরকারি মোবাইল নম্বরে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও ফোনটি বন্ধ পাওয়া যায়।
অনুসন্ধান অব্যাহত রয়েছে। পরবর্তী সংখ্যায় এ বিষয়ে আরও তথ্য প্রকাশ করা হবে।