অনলাইন ডেস্ক: দেশব্যাপী সবুজায়ন জোরদার, জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব মোকাবিলায় বড় পরিসরের বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি হাতে নিয়েছে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর (ডিপিই)। ‘ওয়ান চাইল্ড, ওয়ান ট্রি’ উদ্যোগের আওতায় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা এই সরকারের মেয়াদে সর্বমোট ৫ কোটি গাছ লাগাবে। এর মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের পরিবেশ সচেতন করে তোলার পাশাপাশি জাতীয় বৃক্ষরোপণ কর্মসূচিকে তৃণমূল পর্যায়ে বিস্তৃত করা হবে।
সরকার আগামী ৫ বছরে সারাদেশে নতুন করে ২৫ কোটি গাছ লাগানোর চিন্তা ভাবনা করছে। সারাদেশে এক কোটিরও বেশি প্রাথমিক শিক্ষার্থী থাকায় এই সময়ে সর্বমোট ৫ কোটি গাছ লাগানোর সুযোগ রয়েছে। গাছ লাগানোর পাশাপাশি এসব গাছ পরিচর্যা, বৃক্ষরোপণকে একাডেমিক পাঠ্য কর্মসূচিতে অন্তর্ভুক্ত করে বছর শেষে মূল্যায়নের মাধ্যমে শিশুদের বৃক্ষরোপণ সম্পর্কে ছোটবেলা থেকেই সচেতন করা হবে। গাছ লাগানোর পাশাপাশি রক্ষণাবেক্ষণ ও পরিচর্যায় বৃক্ষ প্রতি প্রতিবছর ৫০০ টাকা খরচ পাবে শিক্ষার্থীরা।
প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের প্রস্তুত করা কর্মপরিকল্পনা অনুযায়ী, দেশের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে বর্তমানে প্রায় ১ কোটি ৬ লাখ শিক্ষার্থী অধ্যয়ন করছে।
পরিকল্পনা অনুযায়ী শিক্ষার্থীদের মাধ্যমে বছরে প্রায় ৮০ লাখ এবং বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে প্রায় ২০ লাখ গাছ লাগানো হবে। ফলে প্রতি বছর মোট ১ কোটি করে ৫ বছরে ৫ কোটি গাছ রোপণের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
দেশে বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি চললেও স্থান নির্বাচনগত সমস্যায় অনেক সময় বাস্তবায়ন কঠিন হয়ে পড়ে। সারাদেশের প্রায় ৬৫ হাজার বিদ্যালয়ের মাঠ ও বিদ্যালয় আঙিনায় অনেক স্থান খোলা পড়ে আছে। তা ছাড়া অনেক বিদ্যালয়ে দেয়াল না থাকায় নিরাপত্তার ঘাটতি রয়েছে। প্রতিবছর নির্দিষ্ট হারে গাছ রোপণের মাধ্যমে এই সমস্যাও অনেকাংশে কমে যাবে বলে মনে করছে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর।
কর্মকর্তারা বলছেন, শিক্ষার্থীদের ছোটবেলা থেকেই পরিবেশ রক্ষা ও বৃক্ষরোপণের গুরুত্ব সম্পর্কে সচেতন করে তুললে ভবিষ্যতে একটি দায়িত্বশীল ও পরিবেশবান্ধব প্রজন্ম গড়ে তোলা সম্ভব হবে। একই সঙ্গে বিদ্যালয় কেন্দ্র করে স্থানীয় পর্যায়েও সবুজায়ন বাড়বে। নতুন এ কর্মসূচিতে শুধু গাছ প্রদান করেই শেষ হবে না। প্রতিটি গাছ সুরক্ষা, পরিচর্যার মাধ্যমে পরিবেশ জ্ঞান অর্জন ছাড়াও পাঠ্যপুস্তকে এ সংক্রান্ত অধ্যায় যুক্ত করা হবে। পাশাপাশি বছর শেষে শিক্ষার্থীদের মূল্যায়নেও রোপিত গাছকে বিবেচনায় নেবে শিক্ষকরা। এই উদ্যোগ প্রাথমিকের বৃক্ষরোপণ কর্মসূচিকে টেকসই করবে বলে মনে করছেন তারা।
তথ্যমতে, সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও আশপাশের খালি জায়গায় গাছ লাগানোর পরিকল্পনা রয়েছে। প্রতিটি বিদ্যালয়ে ২০টি করে গাছ লাগানো হলে বছরে ২০ লাখ গাছ রোপণ করা সম্ভব। পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের বসত বা ভাড়া বাড়ির আশেপাশে গাছ লাগানোর সুযোগ রয়েছে। কর্মসূচির আওতায় গাছের চারা বন বিভাগ থেকে নিয়ে বিদ্যালয়গুলোতে বিনামূল্যে সরবরাহ করা হবে। গাছ রোপণ ও পরিচর্যার জন্য ৫০০ টাকা ব্যয় ধরা হয়েছে। প্রতিটি চারার গর্ত তৈরি, মাটি প্রস্তুত ও চারা রোপণে ৫০ টাকা, সার প্রয়োগ ও পরিচর্যার জন্য ১৫০ টাকা এবং গাছের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বেড়া বা সাপোর্ট দিতে ১৫০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। এছাড়া পানি সরবরাহ ও নিয়মিত পরিচর্যার জন্য আরও ১৫০ টাকা ধরা হয়েছে। ডিপিই কর্তৃপক্ষ বলছে, বিদ্যালয় প্রাঙ্গণের ২০ লাখ গাছ পরিচর্যার দায়িত্ব থাকবে অধিদপ্তরের ব্যবস্থাপনায়।
প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক আবু নূর মো. শামসুজ্জামান বলেন, ‘ওয়ান চাইল্ড-ওয়ান ট্রি- শুধু বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি নয়, এটি শিক্ষার্থীদের মধ্যে পরিবেশ সচেতনতার প্রাথমিক পাঠ। ছোটবেলা থেকেই শিক্ষার্থীদের মধ্যে পরিবেশের প্রতি দায়িত্ববোধ তৈরি হলে ভবিষ্যতে তারা পরিবেশ সংরক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারবে।
সরকার ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণের যে কর্মসূচি নিয়েছে সেখানে প্রাথমিকের শিক্ষার্থীরাই ৫ কোটি গাছ লাগিয়ে পরিচর্যার মাধ্যমে বড় করবে। এই উদ্যোগের ফলে কোমলমতি শিশুরা পরিবেশ সচেতনতায় ভবিষ্যতে বড় ভূমিকা রাখবে।
জানা গেছে, পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের সাথে আলোচনার পর দেশের ৮টি বিভাগীয় শিক্ষা অফিসে এ সংক্রান্ত চিঠি দেয় প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর। সরকারের নির্বাচনী ইশতেহার-২০২৬ এর আলোকে গৃহীত বৃক্ষরোপণ কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়নে সকল প্রাথমিক বিদ্যালয়ের কতসংখ্যক গাছ লাগানো সম্ভব, তার তালিকা তৈরির নির্দেশনা দেওয়া হয়। সর্বশেষ ২ মার্চ অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে বিস্তারিত কর্ম পরিকল্পনা ও কর্মকৌশল তৈরি করে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সচিবকে দেওয়া হয়। বিদ্যালয় থেকে তালিকা পাওয়ার পর মাঠ পর্যায়ে শিক্ষার্থীদের মাধ্যমে বৃক্ষরোপণের কাজ শুরু করবে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর।
এ সংক্রান্ত নথিপত্রে দেখা গেছে, সচেতনতা কার্যক্রম, প্রস্তুতিমূলক সভার পর বিদ্যালয় পর্যায়ে বৃক্ষরোপণের পরিকল্পনা প্রণয়ন করা হবে। এ সময় শিক্ষক, শিক্ষা কর্মকর্তা এবং স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে পুরো বিষয়টি সমন্বয় করবে। মার্চ ও এপ্রিল মাসে চারা সংগ্রহের ব্যবস্থা, গাছের ধরণ নির্বাচন, গাছ লাগানোর উপযুক্ত স্থান নির্ধারণ করা হবে। পাশাপাশি স্থানীয় প্রশাসন, কৃষি বিভাগ ও বন বিভাগের সঙ্গে সমন্বয় জোরদার করা হবে। এরপর মে মাসে চূড়ান্ত প্রস্তুতি সম্পন্ন করে জুন মাস থেকে সারাদেশে আনুষ্ঠানিকভাবে বৃক্ষরোপণ কার্যক্রম শুরু করা হবে।
প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর বলছে, বৃক্ষরোপণ কর্মসূচিকে দীর্ঘমেয়াদে কার্যকর করতে বিষয়টি শিক্ষাব্যবস্থার সঙ্গেও যুক্ত করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। বিদ্যালয়ের সহপাঠ্যক্রমিক কার্যাবলিতে বৃক্ষরোপণের বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করা হবে। পাঠদানের মধ্যেও পরিবেশ সংরক্ষণ ও বৃক্ষের গুরুত্ব নিয়ে আলোচনা থাকবে। শিক্ষার্থীরা যে গাছ লাগাবে, সেগুলোর পরিচর্যা কেমন হচ্ছে তা পর্যবেক্ষণের জন্য ধারাবাহিক মূল্যায়নের ব্যবস্থাও রাখা হবে। এতে শিক্ষার্থীদের দায়িত্ববোধ তৈরি হবে এবং গাছগুলোর টেকসই পরিচর্যাও নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।
জানা গেছে, কর্মসূচিকে আরও উৎসাহিত করতে শ্রেষ্ঠ সবুজ বিদ্যালয় ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নির্বাচন করে পুরস্কার দেওয়ার পরিকল্পনাও রয়েছে। যে বিদ্যালয়গুলো সফলভাবে বৃক্ষরোপণ ও পরিচর্যা কার্যক্রম বাস্তবায়ন করতে পারবে, সেগুলোকে স্বীকৃতি দেওয়া হবে। এছাড়া গাছের বৃদ্ধি ও সংরক্ষণ নিয়ে শিক্ষার্থীদের মধ্যে সচেতনতা বাড়াতে বিভিন্ন আলোচনা সভা, প্রদর্শনী এবং শিক্ষামূলক কার্যক্রম আয়োজন করা হবে।