ইরানে সামরিক তৎপরতা প্রায় শেষের দিকে: ডোনাল্ড ট্রাম্প

বিশ্ব

অনলাইন ডেস্ক: ইরানের ওপর আকস্মিক হামলা চালানোর এক মাস পর অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক চাপের মুখে বুধবার রাতে জাতির উদ্দেশে ভাষণ দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি ক্রমেই অজনপ্রিয় হয়ে ওঠা এই সংঘাতকে সমর্থন করলেও দেশবাসীকে আশ্বস্ত করে বলেন, মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক তৎপরতা ‘প্রায় শেষের দিকে’। তবে একই সঙ্গে তিনি ইরানের ওপর ‘অত্যন্ত কঠোর আঘাত’ হানার কথাও জানান।

হোয়াইট হাউস থেকে দেওয়া ভাষণে ট্রাম্প বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র তার বেশির ভাগ সামরিক লক্ষ্য খুব শিগগিরই পূরণ করতে যাচ্ছে।

তিনি বলেন, ‘আমরা খুব শিগগিরই আমাদের সব সামরিক লক্ষ্য শেষ করার পথে রয়েছি। তবে আমরা তাদের (ইরান) ওপর খুব কঠিন আঘাত হানব। ট্রাম্প আরো জানান, আগামী দুই থেকে তিন সপ্তাহের মধ্যে পরিস্থিতি আগের অবস্থায় ফিরে আসতে পারে।
ভাষণে ট্রাম্প ২৮ ফেব্রুয়ারির বোমা হামলার উদ্দেশ্য নিয়েও ব্যাখ্যা দেন।

তিনি বলেন, এই হামলা তার বহু বছরের রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতিরই অংশ। তার মূল লক্ষ্য হলো ইরানের পারমাণবিক কার্যক্রম বন্ধ করে দেওয়া। ট্রাম্প বলেন, ‘২০১৫ সালে যেদিন আমি প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের প্রচারণা শুরু করি, সেদিন থেকেই প্রতিজ্ঞা করেছি, ইরানকে কখনোই পারমাণবিক অস্ত্র পেতে দেব না। তারা বহু বছর ধরে এর খুব কাছাকাছি ছিল।

সবাই বলে ইরানের পারমাণবিক অস্ত্র থাকা উচিত নয়। কিন্তু সময় এলে যদি পদক্ষেপ নিতে না চান, তাহলে সেসব কথা শুধু কথাই থেকে যায়।’
মধ্যবর্তী নির্বাচনের মাত্র ছয় মাস আগে এমন এক সংঘাতের পরিণতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করছে হোয়াইট হাউস। এই সংঘাতের কারণে, গ্যাসের দাম আকাশছোঁয়া হয়েছে। ট্রাম্প ও অর্থনীতি ঘিরে অনেক আমেরিকানের মনে অসন্তোষ তৈরি হয়েছে।

এই পরিস্থিতিতে প্রশাসন নিজেদের পদক্ষেপের পক্ষে সাফাই গাইছে এবং সরাসরি আমেরিকান জনগণের সমর্থন চাইছে।
যদিও তিনি বলেছেন, ইরানের সঙ্গে আলোচনা ‘চলমান’। ট্রাম্প পাকিস্তান সরকারের মাধ্যমে তেহরানে পাঠানো তার ১৫টি দাবির তালিকার কথা উল্লেখ করেননি। এ ছাড়া, বুধবারের শুরুতে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের যুদ্ধবিরতির প্রস্তাবের কথাও তিনি বলেননি। অন্যদিকে ইরান সরকার এ ধরনের কোনো প্রস্তাব দেওয়ার কথা অস্বীকার করেছে। হরমুজ প্রণালীর নিয়ন্ত্রণ ও মার্কিন ও ইসরায়েলি বিমান হামলায় হওয়া ধ্বংসযজ্ঞের জন্য যুদ্ধকালীন ক্ষতিপূরণসহ নিজস্ব কিছু দাবি জানিয়েছে।

প্রশাসন এই সংঘাতের উদ্দেশ্য নিয়ে বারবার ভিন্ন ভিন্ন ব্যাখ্যা দিয়েছে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও একদিকে যুদ্ধ দ্রুত শেষ করার কথা বলেছেন, আবার অন্যদিকে প্রয়োজনে সংঘাত আরো বাড়ানোর হুমকিও দিয়েছেন। এদিকে আলোচনায় অগ্রগতি হয়েছে, ট্রাম্পের এমন দাবির সঙ্গে একমত নন ইরানের নেতারা।

এক মাসের কিছু বেশি সময় আগে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের ওপর হামলা চালায়। এর আগে ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে আটক করার অভিযানের পর মাত্র দুই মাসের মধ্যে এটি ছিল যুক্তরাষ্ট্রের দ্বিতীয় বড় সামরিক পদক্ষেপ। ট্রাম্পের ভাষায়, একটি ‘সুনির্দিষ্ট অভিযান’ চালিয়ে কয়েক দিনের মধ্যেই ইরানের সর্বোচ্চ নেতাসহ আরো এক ডজনের বেশি শীর্ষ নেতাকে হত্যা করা হয়।

তবে গত এক মাসে এই সংঘাতের ক্ষতি ক্রমেই বাড়ছে, অর্থনৈতিক অস্থিরতা বেড়েছে এবং প্রাণহানিও ঘটছে। ইরানের নেতারা হরমুজ প্রণালী অবরোধ করে দিয়েছে, যা বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস পরিবহনের গুরুত্বপূর্ণ পথ। ফলে তেলবাহী ট্যাংকার চলাচল প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। যুক্তরাষ্ট্রে এক গ্যালন পেট্রোলের গড় দাম ৪ ডলার ছাড়িয়ে গেছে।

বুধবার ট্রাম্প বলেন, গ্যাসের দামের এই বৃদ্ধি ‘স্বল্প সময়ের জন্য’ হবে। তার মতে, বাণিজ্যিক তেলবাহী ট্যাংকারের ওপর ইরানের হামলার কারণেই এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।

অন্যদিকে হঠাৎ করে শুরু হওয়া এক সংঘাতে আমেরিকার মিত্ররা চরমভাবে ক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছে, যা বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক বিপর্যয় সৃষ্টি করছে। ঠিক সেই সময়েই যুক্তরাষ্ট্র তাদের আকাশসীমা ও সামরিক ঘাঁটি ব্যবহার করে আরো হামলা চালাচ্ছে। হাজার হাজার মার্কিন সেনাকে মধ্যপ্রাচ্যে পাঠানো হয়েছে। এই যুদ্ধে মধ্যে ১৩ জন মার্কিন সেনাও নিহত হয়েছেন।

কিছু রিপাবলিকান নেতা ও ট্রাম্পের সমর্থকেরা বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র থেকে প্রায় সাত হাজার মাইল দূরের একটি দেশে এক মাস ধরে চলা এই সামরিক অভিযান ট্রাম্পের দীর্ঘদিনের ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতির সঙ্গেও সাংঘর্ষিক। কারণ গত এক দশক ধরে ট্রাম্প এই নীতির মাধ্যমে বিদেশে কম হস্তক্ষেপের কথা বলে আসছিলেন।

সমালোচক ও সমর্থক, উভয় পক্ষের কাছেই এই যুদ্ধে জড়ানোর অর্থনৈতিক প্রভাব গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ট্রাম্প এমন সময়ে এই সংঘাতে জড়িয়েছেন, যখন তার আমলেই এক ব্যারেল তেলের দাম ১০০ ডলার ছাড়িয়ে গেছে। অথচ তিনি আগে মুদ্রাস্ফীতি কমানো এবং যুক্তরাষ্ট্রে সমৃদ্ধির এক ‘সোনালী যুগ’ আনার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন।

ওয়াশিংটন পোস্টের এক জরিপ বিশ্লেষণে দেখা গেছে, সম্প্রতি ১০ হাজারের বেশি আমেরিকানের ওপর করা পাঁচটি সমীক্ষায় প্রায় ১০ জনের মধ্যে ৬ জনই ইরান সংঘাতের বিরোধিতা করেছেন।

এ ছাড়া মার্চের মাঝামাঝি সময়ে পিউ রিসার্চ সেন্টারের এক জরিপে ৫৯ শতাংশ মানুষ বলেছেন, ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক শক্তি ব্যবহার করে যুক্তরাষ্ট্র ভুল সিদ্ধান্ত নিয়েছে। অন্যদিকে ফক্স নিউজের এক জরিপে দেখা গেছে, ৫৮ শতাংশ মানুষ ইরানের বিরুদ্ধে বর্তমান মার্কিন সামরিক পদক্ষেপের বিরোধিতা করেন। আর ৬৫ শতাংশ আমেরিকান মনে করেন, ট্রাম্প প্রশাসন এই সংঘাতের উদ্দেশ্য স্পষ্টভাবে ব্যাখ্যা করতে পারেনি।

এই সপ্তাহে ট্রাম্প সংঘাত থেকে সরে আসার কথা জানিয়েছেন। আবার পাশাপাশি ওই অঞ্চলে সামরিক বাহিনীও বাড়িয়েছেন। মঙ্গলবার ট্রাম্প উভয় পক্ষের মধ্যে একটি চুক্তির বিষয়টি থেকেও সরে আসেন। তার দাবি, ইরানের নতুন শাসনব্যবস্থা ইতিমধ্যেই ‘অনেক বেশি সহজলভ্য’ হয়ে গেছে।

ওভাল অফিসে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, ‘আমার সঙ্গে তাদের কোনো চুক্তি করার দরকার নেই। যখন আমরা নিশ্চিত হব যে, ইরান পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করতে পারবে না, তখন আমরা সরে যাব। তখন চুক্তি হোক বা না হোক, সেটি গুরুত্বপূর্ণ নয়।’

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


The reCAPTCHA verification period has expired. Please reload the page.