কুমিল্লায় করোনা আতংকে প্রায় হাসপাতাল বন্ধ,চেম্বার থেকেও ডাক্তাররা উদাও

অপরাধ

অনলাইন নিউজ ডেস্ক :
হাসপাতালের শহর কুমিল্লায় করোনা আতঙ্কে ডাক্তার শূন্য হয়ে পড়েছে। বন্ধ হয়ে পড়েছে ছোট ও মাঝারি আকারের হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলো। এতে চিকিৎসার অভাবে দুর্ভোগে পড়তে হচ্ছে শত শত সাধারণ মানুষ ও মুমূর্ষু রোগীদেরকে। কুমিল্লার জেলা–উপজেলায় ছোট–বড় পাঁচশতাধিক বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার রয়েছে। সাধারণ থেকে জটিল রোগে আক্রান্ত রোগীরা একাধিক হাসপাতাল ঘুরেও চিকিৎসকদের দেখা পাচ্ছেন না

গত ২৮ মার্চ কুমিল্লার বুড়িচং থেকে এক প্রসূতি অসুস্থ হয়ে পড়লে স্বজনরা তাকে কুমিল্লায় নিয়ে আসে চিকিৎসার জন্য। ওই প্রসূতি উপজেলার করিমাবাদ এলাকার মেজর আবদুর রউফের ছেলে স্ত্রী। প্রথমে কুমিল্লা মেডিকেল সেন্টার (টাওয়ার) হাসপাতালে নেয়া হয়। কর্তব্যরত ডাক্তার প্রসূতির স্বজনদের জানান আলট্রাসনোগ্রাফি করানো ছাড়া তিনি কিছুই করতে পারবেন না। ডাক্তার না থাকায় আলট্রাসনোগ্রাফির নেই কোন ব্যবস্থা। পরে গুরুতর অবস্থায় কুমিল্লা মডার্ন হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে আলট্রাসনোগ্রাফি এবং ডাক্তার কোনটাই পায়নি। নিয়ে যাওয়া হয় কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে, সেখানেও আল্ট্রাসনোগ্রাফির জন্য কোন চিকিৎসাসেবা দিতে পারেনি ডাক্তার। শেষ পর্যন্ত ওই প্রসূতি চিকিৎসক এবং আল্ট্রাসনোগ্রাফির অভাবে মৃত্যুবরণ করে।

প্রসূতির শ^শুর মেজর আবদুর রউফের দাবি ওইদিন হাসপাতালে নেওয়ার পর ভালো ডাক্তার এবং চিকিৎসাসেবা পেলে তার ছেলের বউকে এইভাবে চোখের সামনে হারাতে হতো না।

মঙ্গলবার সরেজমিনে গিয়ে নগরীর বড় বড় কয়েকটি হাসপাতাল ঘুরে দেখা যায়, আগের মত বিভিন্ন রোগের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের রুমের সামনে রোগী ও তার স্বজনদের ভীড় নেই। দরজায় দরজায় তালা ঝুলছে। হুইল চেয়ার এবং ট্রলির আওয়াজ নেই। নেই সাড়া শব্দ। চারদিকে যেন সুনসান নিরবতা।

এদিকে টমছম ব্রিজে ইউনাইটেড হাসপাতাল এবং এশিয়া ক্লিনিক নামে এই ধরণের ছোট ও মাঝারি আকারের চিকিৎসাসেবা প্রতিষ্ঠানগুলো চিকিৎসকের অভাবে বন্ধ হয়ে গেছে।

কুমিল্লা মেডিকেল সেন্টার (টাওয়ার) বেসরকারি হাসপাতালে গিয়ে দেখা যায়, ডাক্তার এবং রোগী শূন্য। চার ভাগের তিনভাগ চিকিৎসকের দরজা তালাবদ্ধ। মেডিসিন বিশেষজ্ঞ প্রফেসর ডাঃ মোঃ আজিজুল হক, লিভাররোগ ও মেডিসিন বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডাঃ আব্দুর রব সরকার, স্ত্রী ও প্রসূতি বিদ্যা বিশেষজ্ঞ ও সার্জন অধ্যাপক ডাঃ শামছুন নাহার, গাইনি বিশেষজ্ঞ ডাঃ কামরুন নাহার, শিশু–কিশোর মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডাঃ মোঃ আবুল বাশার, অর্থো সার্জারী বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডাঃ মোঃ সফিকুর রহমান পাটোয়ারী এবং চক্ষু বিশেষজ্ঞ ও সার্জন অধ্যাপক্ষ ডাঃ মোহাম্মদ বেলাল ঘোষণা দিয়ে দরজায় বিজ্ঞপ্তি সাঁটিয়েছেন অনির্দিষ্টকালের জন্য তিনি রোগী দেখবেন না। বাকী অধিকাংশ চিকিৎসকরা ঘোষণা না দিয়েই করোনা আতঙ্কে রোগী দেখছেন না।

এরপর বেসরকারি চিকিৎসাসেবা প্রতিষ্ঠান কুমিল্লার মুন হাসপাতালে গিয়ে দেখা যায় একই দৃশ্য। হাতেগোনা দুই–তিনজন চিকিৎসক ছাড়া অধিকাংশ ডাক্তারদের দরজা তালাবদ্ধ। চিকিৎসকদের না পেয়ে হতাশা নিয়ে ফিরে যেতে দেখা গেছে রোগী ও তার স্বজনদের। কোন ধরনের ঘোষণা ছাড়াই রোগী না দেখাদের মধ্যে রয়েছেন হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ ডাঃ শেখ মারুফুজ্জামান, ইউরোলজি বিশেষজ্ঞ ও সার্জন ডাঃ মোঃ সারোয়ার হোসেন খান (শুভ), নবজাতক, শিশু ও কিশোর বিশেষজ্ঞ ডাঃ মিয়া মনজুর আহমেদ, শিশু বিশেষজ্ঞ ডাঃ নাজনীন আক্তার এবং ডাঃ সাইফুল ইসলাম ভূঁইয়া ছাড়াও অন্যান্য চিকিৎসকদেরও একই অবস্থা।

এই ছাড়াও একই অবস্থা কুমিল্লার ট্রমা সেন্টারেও। ট্রমা সেন্টারের মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডাঃ নীহার রঞ্জন মজুমদার ও ডাঃ মোহাম্মদ জহির উদ্দিনসহ বিভিন্ন রোগের অধিকাংশ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের দরজায় বিজ্ঞপ্তি ঝুলছে।

মঙ্গলবার সকালে কুমিল্লার নাঙ্গলকোটের অজপাড়াগাঁ থেকে অসুস্থ বাবাকে নিয়ে কুমিল্লার ট্রমা সেন্টারে মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডাঃ নীহার রঞ্জন মজুমদারের কাছে আসেন রুমা আক্তার রুনি। রুমা জানান, তার বাবা ব্রেন স্ট্রোকের রোগী। সকালে ১০টার দিকে ট্রমাতে এসেছেন কিন্তু ডাঃ নীহার রঞ্জন মজুমদার নেই। ডাক্তারের এক সহকারী দেখে কয়েকটি পরীক্ষা দিয়েছেন। এখানেই শেষ। বাবাকে ডাক্তার দেখাতে পারবে কিনা এই নিয়ে তিনি বসে আছেন।

তিনি আরও জানান, ডাঃ নীহার রঞ্জন মজুমদারকে না পেয়ে তিনি ও তার ভাই কুমিল্লা টাওয়ার, মুন এবং সিডি প্যাথ হাসপাতালেও খোঁজ নিয়েছেন। কোথাও মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডাক্তার নেই।

সরেজমিনে গিয়ে আরও দেখা যায়, টাওয়ার, মুন ও ট্রমা হাসপাতালের মত কুমিল্লার আরও কিছু বড় বেসরকারি হাসপাতাল সিডিপ্যাথ, মডার্ন, মিডল্যান্ড, মুক্তি ও পপুলার হাসপাতালে একই দৃশ্য।

কুমিল্লার চান্দিনা থেকে মাকে নিয়ে নিশু ও তার বোন আসেন পালমোনোলজিষ্ট ও বক্ষ মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডাঃ ইমাম উদ্দিন আহম্মদের কাছে। কিন্তু এসে দেখেন চিকিৎসকের দরজায় নোটিশ সাঁটানো অনিবার্য কারণ বসত চেম্বার বন্ধ। তখন তারা হতাশ হয়ে বাড়িতে ফিরে যেতে হয়েছে। নিশু জানান, সড়কে গাড়ি না থাকায় খুব কষ্ট করে এতলম্বা পথ পাড়ি দিয়ে মাকে নিয়ে কুমিল্লায় এসেছি। কোথাও কোন ডাক্তার পাচ্ছি না।

এছাড়াও রোগী না দেখার ঘোষণা দিয়েছেন স্বাস্থ্য, মেডিসিন ও নিউরো মেডিসির বিশেষজ্ঞ ডাঃ পঞ্চানন দাশ, ডাঃ কার্তিক চন্দ্র সূত্রধর। ডা.পঞ্চানন দাশ অবশ্য নোটিশে তার অসুস্থতার কথা উল্লেখ করেছেন। চেম্বার বন্ধ ঘোষণা করেছেন শিশু বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা কে এ মান্নান, শিশু ও কিশোর রোগ বিশেষজ্ঞ ডাঃ মাহবুবুল আলম এবং ডাঃ এ বি এম খুরশীদ আলম।

চিকিৎসকরা কেন নোটিশ দিয়ে রোগী দেখছেন না? জানতে চাইলে কুমিল্লা মেডিকেল সেন্টার (টাওয়ার) হাসপাতালের প্রশাসনিক কর্মকর্তা ওমর ফারুক সুজন জানান, করোনাভাইরাস আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ার পর থেকে চিকিৎসকরা স্বেচ্ছায় হাসপাতালে আসা কমিয়ে দিয়েছেন। রোগী না দেখার যে নোটিশ সাাঁটানো হয়েছে সেটার কারণ বিভিন্ন ওষুধ কোম্পানির কর্মীদের সাথে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন রাখার জন্য।

তিনি আরও জানান, প্রথম দিকে রোগী দেখায় চিকিৎসকরা পিপিই সংকট থাকার অজুহাত দেখলেও বর্তমানে হাসপাতাল থেকে ডাক্তারদের পর্যাপ্ত পরিমাণের পিপিই দেয়া হয়েছে। আমরা জোর করতে পারছি না। তাদের দায়িত্ব ও ইচ্ছার উপর নির্ভর করছে।

করোনা দুর্যোগে চিকিৎসকরা চেম্বারে থেকে রোগীদের সেবা না দেওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে কুমিল্লার সিভিল সার্জন ডাঃ মো. নিয়াতুজ্জামান জানান, কুমিল্লার ডিসি, এসপি, বিএমএ, স্বাচিপ এবং চিকিৎসক নেতাদের মাধ্যমে ডাক্তারদের একাধিকবার অনুরোধ করা হয়েছে করোনার এই দুর্যোগে অসুস্থ মানুষের পাশে দাঁড়ানোর জন্য। আহবান করা হয়েছে চেম্বারে ফিরে আসার জন্য। যেন সাধারণ মানুষ ও রোগীদের ভোগান্তি ও দুর্ভোগে না পড়েন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


The reCAPTCHA verification period has expired. Please reload the page.