এম শাহীন আলম :
জাতীয় সংসদ নির্বাচনে কোনো বৈধ প্রার্থীর মৃত্যু হলে অথবা আইনি জটিলতায় কারো প্রার্থিতা বাতিল হলে ঐ আসনের নির্বাচনী কার্যক্রম স্থগিত করার বিধান রয়েছে। গণ-প্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও) ১৯৭২-এর সংশোধিত বিধি অনুযায়ী নির্বাচন কমিশন (ইসি) এমন পরিস্থিতিতে পুনরায় নতুন তফসিল ঘোষণা করবে এটাই বিধান রয়েছে।
গত ৩০ ডিসেম্বর (মঙ্গলবার) সকাল ৬টায় বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া মৃত্যুবরণ করেছেন। তার মৃত্যুতে নির্বাচন স্থগিত হবে কি না তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
নির্বাচনী বিধি অনুযায়ী গণ-প্রতিনিধিত্ব আদেশ ১৯৭২-এর অনুচ্ছেদ ১৭(১) অনুযায়ী, প্রার্থিতা প্রত্যাহারের সময়সীমা পার হওয়ার পর যদি কোনো বৈধভাবে মনোনীত প্রার্থী মৃত্যুবরণ করেন কিংবা অনুচ্ছেদ ৯১ক ও ৯১ঙ অনুযায়ী কারো প্রার্থিতা বাতিল হয়,তবে রিটার্নিং কর্মকর্তা গণবিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে ওই আসনের নির্বাচন কার্যক্রম বাতিল করবেন। আইনে অনুযায়ী নির্বাচন বাতিল হলে কমিশনকে তাৎক্ষণিকভাবে অবহিত করতে হবে এবং কমিশন নতুন নির্বাচনী তফসিল ঘোষণা করবে এটাই নিয়ম।
এছাড়া যারা আগের তফসিলে বৈধভাবে মনোনয়নপত্র দাখিল করেছিলেন, তাদের নতুন করে মনোনয়নপত্র বা জামানতের টাকা জমা দিতে হবে না বলেও ইসি সূত্রে জানা যায়।
নির্বাচন কমিশন সূত্র ও সংবিধান অনুযায়ী আইনে যেহেতু বলা আছে বৈধ প্রার্থী মৃত্যুবরণ করলে তফসিল বাতিল হবে। সেক্ষেত্রে খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে এই তফসিলে কোনো প্রভাব পড়বে না। কারণ, উনি এখনো বৈধ প্রার্থী হননি। এ ছাড়া খালেদা জিয়ার অবস্থা বিবেচনায় বিএনপি উনার আসনগুলোতে বিকল্প প্রার্থী রেখেছে। কাজেই এটা নিয়ে সমস্যা হবে না বলে ইসি সূত্রমতে জানা যায়।
এরেই মধ্যে আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার সময়সীমা সোমবার (২৯ ডিসেম্বর) শেষ হয়েছে। নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার নামে বগুড়া, দিনাজপুর ও ফেনীর তিনটি আসনে মনোনয়ন জমা দেওয়া হয়। আসনগুলোতে বিএনপির পক্ষ থেকে বিকল্প প্রার্থীও মনোনয়ন জমা দিয়েছে।
অন্যদিকে গত ২৪ সালের জুলাই আগস্ট বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলনে লুট হওয়া অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার না হওয়া পর্যন্ত জাতীয় সংসদ নির্বাচন স্থগিতের দাবিতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে লিগ্যাল নোটিশ পাঠিয়েছেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মো. মাহমুদুল হাসান। জনস্বার্থে এ নোটিশ পাঠানো হয়েছে বলে আবেদনে বলা হয়। গত ১৪ ডিসেম্বর ২০২৫ (রোববার) এ সংক্রান্ত নোটিশ মন্ত্রিপরিষদ সচিব, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সচিব, আইন বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব, নির্বাচন কমিশনের সচিব, পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) এবং র্যাবের মহাপরিচালক বরাবর পাঠানো হয়।
এ নোটিশে বলা হয়, ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে ফ্যাসিবাদের পতন ঘটলেও দেশ এখনো গভীর নিরাপত্তা সংকটে রয়েছে। ওই সময় দেশের বিভিন্ন থানা ও নিরাপত্তা স্থাপনা থেকে বিপুল পরিমাণ আগ্নেয়াস্ত্র ও গোলাবারুদ লুট হয়, যার বড় অংশ এখনো উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। এসব অবৈধ অস্ত্র অপরাধী ও সন্ত্রাসীদের হাতে থাকায় আসন্ন জাতীয় নির্বাচনে ভোটার ও প্রার্থীদের জীবনের নিরাপত্তা মারাত্মকভাবে ঝুঁকির মুখে পড়েছে।
আইনজীবী মো. মাহমুদুল হাসান গণমাধ্যমকে বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে নির্বাচনী সহিংসতা ইতোমধ্যেই দৃশ্যমান হতে শুরু করেছে। অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার না করে নির্বাচন আয়োজন করা হলে তা নাগরিকদের প্রাণনাশের ঝুঁকি বাড়াবে এবং সংবিধানের ৩২ অনুচ্ছেদে নিশ্চিত করা জীবনের অধিকার লঙ্ঘিত হবে।
এ নোটিশে আরো উল্লেখ করা হয়, নির্বাচন কমিশন আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখে একসঙ্গে জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও জুলাই সনদ গণভোট আয়োজনের ঘোষণা দিয়েছে। তবে লুণ্ঠিত অস্ত্র উদ্ধার না হওয়ায় নির্বাচনী পরিবেশ এখন চরম ঝুঁকিপূর্ণ। এর উদাহরণ হিসেবে গত ১২ ডিসেম্বর ঢাকা-৮ আসনের স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য প্রার্থী শরীফ ওসমান হাদির ওপর সন্ত্রাসী হামলার ঘটনা উল্লেখ করা হয়েছে।
এ নোটিশে আরও বলা হয়, জুলাই সনদ গণভোট একটি জাতীয় ঐকমত্যভিত্তিক রাষ্ট্র সংস্কারমূলক প্রক্রিয়া হওয়ায় সেখানে সহিংস প্রতিযোগিতার আশঙ্কা নেই। কিন্তু জাতীয় সংসদ নির্বাচন অত্যন্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক হওয়ায় অবৈধ অস্ত্রের উপস্থিতিতে নির্বাচন আয়োজন আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত হতে পারে।
এ অবস্থায় দাবি জানানো হয়, নির্ধারিত সময় অনুযায়ী জুলাই সনদের ওপর গণভোট অনুষ্ঠিত হলেও লুট হওয়া সব অস্ত্র উদ্ধার ও সুষ্ঠু নির্বাচনী পরিবেশ নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত জাতীয় সংসদ নির্বাচন স্থগিত রাখতে হবে।
এ নোটিশে ৭ দিনের মধ্যে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা না নিলে সংবিধানের ১০২ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী হাইকোর্টে জনস্বার্থে রিট দায়ের করা হবে বলেও জানানো হয়।