
এম শাহীন আলম: কক্সবাজারের টেকনাফ উপজেলার সেন্টমার্টিন দ্বীপে এলজিইডির অধীনে চলমান বঙ্গবন্ধু সড়কের সংস্কার ও উন্নয়ন প্রকল্পে ব্যাপক অনিয়ম এবং নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে। সরেজমিন অনুসন্ধানে এমন নানা অনিয়মের চিত্র সামনে এসেছে।
দেশের একমাত্র প্রবালদ্বীপ সেন্টমার্টিন থেকে গলাচিপা হয়ে ছেঁড়াদ্বীপ পর্যন্ত সংযোগ স্থাপনকারী গুরুত্বপূর্ণ বঙ্গবন্ধু সড়কটি ২০২২-২৩ অর্থবছরে সংস্কারের অনুমোদন পায়। ভৌগোলিক ও প্রাকৃতিক কারণে বর্ষাকালে দ্বীপে যাতায়াত সরকারি নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকায় ২০২৩ সালের মাঝামাঝি সময়ে কাজ শুরু হয়। প্রায় ৪০ শতাংশ কাজ সম্পন্ন হওয়ার পর ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর প্রকল্পটির কাজ বন্ধ হয়ে যায়। এরপর দীর্ঘ সময় ধরে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান কার্যত অদৃশ্য হয়ে থাকে।
তৎকালীন নির্বাহী প্রকৌশলী মামুন খান ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে একাধিকবার চিঠি দিয়ে দ্রুত কাজ সম্পন্নের তাগিদ দেন এবং আইনানুগ ব্যবস্থার হুঁশিয়ারিও দেন। তবে ২০২৫ সালের শেষ দিকে তিনি কক্সবাজার এলজিইডি থেকে বদলি হয়ে ঢাকায় চলে গেলে নতুন নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ সাদেকুজ্জামান সাদেক দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং পুনরায় কাজ শুরু হয়।
অভিযোগ রয়েছে, বর্তমান নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ সাদেকুজ্জামান সাদেকের তত্ত্বাবধানে এবং টেকনাফ উপজেলা প্রকৌশলী রবিউল হোছাইনের যোগসাজশে নিম্নমানের ইটের খোয়া ও সাগরের বালু দিয়ে ব্লক তৈরি করে রাস্তা সংস্কারের কাজ চলছে। স্থানীয় একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের নির্ভরযোগ্য সূত্র জানায়, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সমন্বয়ে দায়সারা কাজ এবং অর্থ আত্মসাতের ঘটনা ঘটছে।
বিশেষ সূত্রে জানা গেছে, ৩ কোটি ২৬ লাখ টাকা ব্যয়ে বঙ্গবন্ধু সড়ক সংস্কার প্রকল্পে কনকর্ড কোম্পানির নির্ধারিত মানসম্মত সামগ্রীর পরিবর্তে নিম্নমানের ব্লক ব্যবহার করা হচ্ছে। এর মাধ্যমে বরাদ্দকৃত অর্থের একটি বড় অংশ আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে।
এ বিষয়ে নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ সাদেকুজ্জামান সাদেকের কাছে অভিযোগ উপস্থাপন করা হলে তিনি বলেন, কাজে কোনো অনিয়ম পাওয়া গেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। একই সঙ্গে সেন্টমার্টিনের বঙ্গবন্ধু সড়ক ছাড়াও টেকনাফের বিজিবি হেডকোয়ার্টার-২ থেকে কচ্ছপিয়া, বাহারছড়া হয়ে গোলাপপুর বাজার সড়কের কাজেও অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। এমনকি কাজ সম্পন্ন হওয়ার আগেই বরাদ্দের সিংহভাগ অর্থ ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে পরিশোধ করা হয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া মহেশখালী, উখিয়া ও কক্সবাজার সদর উপজেলার কয়েকটি প্রকল্পেও অনিয়মের বিষয় তুলে ধরা হয়।
কাজের ওয়ার্ক অর্ডারসহ বিস্তারিত তথ্য চাওয়া হলে নির্বাহী প্রকৌশলী তার দপ্তরের সিনিয়র সহকারী প্রকৌশলী মো. জাহাঙ্গীর আলমকে নির্দেশ দেন সংশ্লিষ্ট উপজেলা প্রকৌশলীদের সঙ্গে যোগাযোগ করে তথ্য সরবরাহের ব্যবস্থা নিতে। এ সময় সিনিয়র সহকারী প্রকৌশলী তাৎক্ষণিকভাবে দুইজন উপজেলা প্রকৌশলীকে ফোন করে জানান, অপরাধ বিচিত্রা পত্রিকার সাংবাদিক এম শাহীন আলম তথ্য চাইলে যেন তা সরবরাহ করা হয়—এটি নির্বাহী প্রকৌশলীর নির্দেশ।
তবে পরবর্তী দুই দিনে টেকনাফ, উখিয়া, মহেশখালী ও কক্সবাজার সদর উপজেলার প্রকৌশলীদের সরকারি মোবাইল নম্বরে একাধিকবার কল করা হলেও কেউ ফোন রিসিভ করেননি। বিষয়টি নির্বাহী প্রকৌশলীকে জানালে তিনি বলেন, “তারা যদি ফোন না ধরেন, আমি কী করতে পারি?” এবং সিনিয়র সহকারী প্রকৌশলীর সঙ্গে যোগাযোগের পরামর্শ দেন।
অন্যদিকে, সেন্টমার্টিনের রাস্তার কাজে অনিয়মের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, উপজেলা প্রকৌশলীকে সরেজমিনে দেখে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে।
সিনিয়র সহকারী প্রকৌশলী মো. জাহাঙ্গীর আলমের সঙ্গে যোগাযোগ করলে তিনি জানান, উপজেলা প্রকৌশলীদের ইতোমধ্যে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সাংবাদিকের কল রিসিভ না করার বিষয়টি অবগত করলে তিনি বলেন, বিষয়টি নির্বাহী প্রকৌশলীকে জানাতে।
পুনরায় নির্বাহী প্রকৌশলীকে ফোন রিসিভ না করার বিষয়ে অবহিত করা হলে তিনি সরাসরি সংশ্লিষ্ট দপ্তরে গিয়ে যোগাযোগ করার পরামর্শ দেন।
স্থানীয় ঠিকাদারদের দাবি, কক্সবাজার এলজিইডির অধীনে বিভিন্ন উপজেলায় একাধিক প্রকল্পে অনিয়ম থাকায় অনেক উপজেলা প্রকৌশলী কাজের তথ্য দিতে অনাগ্রহী এবং এ কারণে ফোন রিসিভ করেন না।
এদিকে, টানা কয়েকদিন চেষ্টা করার পর টেকনাফ উপজেলা প্রকৌশলী রবিউল হোছাইন ফোন রিসিভ করে কিছু তথ্য দিলেও সেন্টমার্টিনের বঙ্গবন্ধু সড়ক সংস্কারে অনিয়মের অভিযোগ বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো ব্যাখ্যা বা সমাধান দিতে পারেননি।

