ঢাকা উত্তরা পাসপোর্ট অফিসে দালাল সিন্ডিকেট সক্রিয় গ্রাহক হয়রানি ও ঘুষ বাণিজ্যের অভিযোগ

অন্যান্য অপরাধ জাতীয় জেলার খবর

বিশেষ প্রতিবেদক :
রাজধানীর উত্তরা আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসে পাসপোর্ট সেবা নিতে গিয়ে হয়রানি, আবেদন ফেরত দেওয়া এবং দালালনির্ভরতার অভিযোগ উঠেছে। সেবাগ্রহীতাদের অভিযোগ, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র থাকা সত্ত্বেও নানা অজুহাতে সরাসরি আবেদন ফেরত দেওয়া হলেও দালালের মাধ্যমে অতিরিক্ত টাকা দিলে সহজেই আবেদন জমা নেওয়া হচ্ছে। সরকারি নির্ধারিত ফির বাইরে সাড়ে তিন হাজার থেকে আট হাজার টাকা কিংবা তারও বেশি অর্থ লেনদেনের অভিযোগ করেছেন কয়েকজন ভুক্তভোগী। এমনকি জরুরি পাসপোর্টের ক্ষেত্রেও দালালদের মাধ্যমে বিশেষ সুবিধা পাওয়ার আশ্বাস সহ জটিল সমস্যা সমাধানের প্রতিশ্রুতি দিয়ে আবেদন নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।

সকল অনিয়ম আর অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছেন উত্তরা আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসের উপপরিচালক (ডিডি) রোজী খন্দকার। স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, তাঁর দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে অফিসটিতে দালাল সিন্ডিকেটের তৎপরতা বেড়েছে বলে দাবি করেছেন একাধিক সেবাগ্রহীতা ও স্থানীয় প্রত্যক্ষদর্শী। তাঁদের অভিযোগ, অফিসের কিছু অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীর সঙ্গে দালালদের যোগাযোগ রয়েছে।

সরেজমিন অনুসন্ধানকালে কবির হোসেন নামে এক সেবাগ্রহীতা জানান, তাঁর প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ঠিক থাকলেও পেশা হিসেবে কৃষি উল্লেখ করায় আবেদন গ্রহণ করা হয়নি। তাঁকে ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান অথবা ওয়ার্ড কাউন্সিলরের কাছ থেকে কৃষক হিসেবে প্রত্যয়নপত্র আনতে বলে তার আবেদনটি ফেরত দেওয়া হয়।

কবির হোসেন তার ভাষ্যে আরো বলেন, আবেদন গ্রহণকারী কর্মকর্তা-কর্মচারীরা তাঁকে জানিয়েছেন, কৃষক হিসেবে প্রত্যয়নপত্র না দিলে আবেদন গ্রহণ করা সম্ভব নয়। তাঁর প্রশ্ন, প্রয়োজনীয় পরিচয়পত্র ও অন্যান্য কাগজপত্র থাকার পরও অতিরিক্ত প্রত্যয়নপত্রের প্রয়োজন কেন? তিনি আরও বলেন, উত্তরা পাসপোর্ট অফিসে সরাসরি আবেদন জমা দেওয়া কঠিন। এ কারণে বাধ্য হয়ে দালালের মাধ্যমে আবেদন করার চেষ্টা করছেন তিনি।

অন্যদিকে জরুরি পাসপোর্ট আবেদনকারী মনির হোসেন (ছদ্মনাম) এর সাথে কথা হলে তিনি জানান, তাঁর আগের পাসপোর্টটি বাড়িতে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় পুড়ে যায়। গ্রামের বাড়ি টাঙ্গাইলে হওয়ায় প্রথমে সেখানকার পাসপোর্ট অফিসে আবেদন করতে গেলে তাঁর আবেদন ফেরত দেওয়া হয়।
পরে দ্রুত পাসপোর্ট পাওয়ার আশায় নিজ এলাকার নুরুজ্জামান নামে এক ব্যক্তির সঙ্গে ২২ হাজার টাকায় সমঝোতা করেন বলে দাবি করেন তিনি। ওই ব্যক্তি তাঁকে ঢাকার আগারগাঁও পাসপোর্ট অফিসের জসিম নামের আরেক ব্যক্তির কাছে পাঠান। জসিমও আবেদন জমা দিতে ব্যর্থ হয়ে উত্তরা পাসপোর্ট অফিসে কর্মরত রানা নামের এক ব্যক্তির কাছে পাঠান। মনিরের দাবি, রানা অফিসের সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে যোগাযোগ করে তাঁর আবেদন জমা দেওয়ার ব্যবস্থা করেন এবং ডেলিভারির কাগজ দেন।
কিন্তু পাসপোর্ট প্রস্তুত হওয়ার এসএমএস পাওয়ার পর নতুন জটিলতার মুখে পড়েন তিনি। অফিস থেকে জানানো হয়, পুরোনো পাসপোর্ট ও থানার জিডির কপি জমা দিতে হবে। মনিরের বক্তব্য, পুরোনো পাসপোর্টটি আগুনে পুড়ে যাওয়ার বিষয়টি জানানোর পরও তাঁকে বারবার একই কাগজ জমা দিতে বলা হচ্ছে। তাঁর দাবি, তিন দিনের মধ্যে পাসপোর্ট পাওয়ার কথা থাকলেও ১৪ দিন পার হয়ে গেছে। এখনো পাসপোর্ট হাতে পাননি।

তিনি আরও অভিযোগ করেন, আবেদন জমা দেওয়ার ক্ষেত্রে সহযোগিতাকারী রানা পরবর্তী সময়ে তাঁর ফোনও ধরছেন না। বিষয়টি নিয়ে রানার সঙ্গে কথা বললে তিনি জানান, একজনের মাধ্যমে মনির তাঁর কাছে এসেছিলেন এবং তিনি সহযোগিতা করেছেন। তবে পাসপোর্ট ডেলিভারি না দিলে তাঁর কিছু করার নেই। কথোপকথনে পাসপোর্ট ছাড় করানোর বিষয়ে অতিরিক্ত খরচের প্রসঙ্গও উঠে আসে বলে অভিযোগ করেছেন মনির।

সরেজমিনে অনুসন্ধানকালে গাজীপুর থেকে আসা আলম নামের আরেক সেবাগ্রহীতা জানান, দ্বিতীয় বিয়ে সংক্রান্ত কাবিননামা ও তালাকের কাগজপত্র নিয়ে জটিলতার কথা উল্লেখ করে গাজীপুর পাসপোর্ট অফিস থেকে তাঁর আবেদন ফেরত দেওয়া হয়। পরে উত্তরা পাসপোর্ট অফিসে এসে একজন দালালের মাধ্যমে সরকারি ফির বাইরে অতিরিক্ত সাড়ে তিন হাজার টাকা দিয়ে কোনো ধরনের ঝামেলা ছাড়াই আবেদন জমা দিতে সক্ষম হন বলে দাবি করেন তিনি।

অনুসন্ধানকালে আশুলিয়া এলাকার বাসিন্দা রিপন মিয়া জানান, পাসপোর্টের আবেদন জমা দিতে গেলে বিভিন্ন অজুহাতে তাঁর আবেদন তিনবার ফেরত দেওয়া হয়। একপর্যায়ে নিরুপায় হয়ে মোস্তফা নামের এক ব্যক্তির সঙ্গে সাড়ে আট হাজার টাকায় সমঝোতা করেন। পরে ওই ব্যক্তির মাধ্যমে আবেদন জমা দিতে সক্ষম হন বলে জানান তিনি।
রিপনের অভিযোগ, সরাসরি আবেদন জমা দিতে গিয়ে বারবার হয়রানির শিকার হলেও দালালের মাধ্যমে অতিরিক্ত টাকা দেওয়ার পর আবেদন জমা দেওয়ার ক্ষেত্রে আর কোনো জটিলতা হয়নি।

রোজী খন্দকার উত্তরা যোগদান করার আগে তিনি বরিশাল বিভাগীয় পাসপোর্ট অফিসে দায়িত্ব পালন করেছেন। সে সময়ও তাঁর বিরুদ্ধে দালালনির্ভর সেবা, পাসপোর্ট ডেলিভারি নিয়ে অনিয়ম এবং অর্থ লেনদেনের অভিযোগ উঠেছিল বলে সংশ্লিষ্ট কয়েকটি সূত্রের দাবি। রোজী খন্দকার বরিশালে কর্মরত থাকা অবস্থায় গ্রাহক ছাড়াও দালালদের হাতে পাসপোর্ট ডেলিভারির ঘটনার প্রমাণ সংরক্ষিত আছে।
অভিযোগ রয়েছে, বরিশালে দায়িত্ব পালনকালে দালালদের মাধ্যমে পাসপোর্ট বিতরণ এবং প্রতিদিন বিকেলে পাসপোর্টপ্রতি অর্থ আদায়ের একটি ব্যবস্থা চালু ছিল।

সরেজমিন অনুসন্ধানে পাওয়া কয়েকজন সেবাগ্রহীতার বক্তব্যে একটি অভিন্ন অভিযোগ উঠে এসেছে সরাসরি আবেদন করতে গেলে নানা ধরনের কাগজপত্রের অজুহাতে আবেদন ফেরত দেওয়া হয়, অথচ দালালের মাধ্যমে গেলে অতিরিক্ত অর্থের বিনিময়ে সেই আবেদনই জমা নেওয়া সম্ভব হয়।
সেবাগ্রহীতাদের অভিযোগ, উত্তরা পাসপোর্ট অফিসের ভেতরে ও বাইরে সক্রিয় একটি দালালচক্র আবেদনকারীদের অসহায়ত্বকে কাজে লাগিয়ে অর্থ আদায় করছে।

অভিযুক্ত উত্তরা পাসপোর্ট অফিসের উপপরিচালক রোজী খন্দকারকে উপরোক্ত নিউজের স্বার্থে তার মোবাইল নাম্বারে একাধিক বার কল দিলেও তিনি ফোন কলটি রিসিভ করেননি। পরবর্তীতে বক্তব্য জানতে পুনরায় তার হোয়াটসঅ্যাপ এসএমএস পাঠালেও তিনি এসএমএস এর রিপ্লাই দেননি।
পাসপোর্ট একটি গুরুত্বপূর্ণ নাগরিক সেবা। এ সেবা পেতে কোনো নাগরিককে দালালের দ্বারস্থ হতে হবে কিংবা সরকারি ফির বাইরে অতিরিক্ত অর্থ দিতে হবেএমন পরিস্থিতি কোনোভাবেই কাম্য নয়। উত্তরা পাসপোর্ট অফিসে উত্থাপিত অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাইয়ে অধিদপ্তরের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নিরপেক্ষ তদন্ত প্রয়োজন।
বিশেষ করে দালালদের সঙ্গে অফিসের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের যোগাযোগ, আবেদন ফেরত দেওয়ার কারণ, সরকারি ফির বাইরে অর্থ আদায়ের অভিযোগ, পাসপোর্ট ডেলিভারিতে বিলম্ব এবং কর্মচারী রানা ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভূমিকা তদন্তের আওতায় আনা জরুরি। একই সঙ্গে উপপরিচালক রোজী খন্দকারের দায়িত্বকালীন কার্যক্রম, অভিযোগ ব্যবস্থাপনা এবং পূর্ববর্তী কর্মস্থলে তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলোর বিষয়েও প্রয়োজনীয় যাচাই হওয়া উচিত।
সেবাগ্রহীতাদের প্রশ্ন পাসপোর্টের মতো গুরুত্বপূর্ণ নাগরিক সেবা পেতে কেন তাঁদের দালালের কাছে যেতে হবে? সরকারি অফিসে সরাসরি আবেদন করলেই যদি হয়রানির শিকার হতে হয়, তাহলে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি নিরসনের দায়িত্ব নেবে কে এই প্রশ্ন থেকেই যায়?
অনুসন্ধান অব্যাহত রয়েছে অনিয়ম বন্ধ না হওয়া পর্যন্ত নিউজ চলমান থাকবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *